দিনাজপুরে কৃষি জমির উর্বর মাটি পুড়ছে ইটভাটায়

দিনাজপুরে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে ইটভাটায় ফসলি জমির মাটি বিক্রি।  ফলে একদিকে কমছে আবাদি জমি, অন্যদিকে জমির উপরি অংশ বা টপসয়েল নিয়ে যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে উর্বরতা। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্মে চলছে এ অরাজকতা।

ভাটা সংলগ্ন জমির মালিকরা এসব প্রভাবশালীদের বাধা দিলেও লাভ হচ্ছে না। আবার বড় বড় ট্রাকে এসব মাটি পরিবহনের কারণে নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক। পরিবহনের সময় মাটির ধুলোয় ছেয়ে যায় চারপাশ। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। 
শিগগিরই ইটভাটার এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এছাড়া এসব ভাটার কারণে অসুখ-বিসুখও বাড়ছে। দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ এইচ এম বোরহান-উল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, “ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ধুলাবালি শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা ও অ্যালার্জির মতো রোগ হয়।”

‘ম্যানেজ’ করে চলে অবৈধ ভাটা

দিনাজপুর জেলায় মোট ইটভাটার সংখ্যা ২৪১টি। এগুলোর মধ্যে কাগজ-কলমে বৈধতা রয়েছে ৬৬টির। বাকি ১৭৫টি ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। প্রশাসনকে “ম্যানেজ” করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে ফসলি জমিতে বসানো হয়েছে ভাটা। আইন অমান্য করে দিনের পর দিন ভাটার সংখ্যা বাড়লেও প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। 

দিনাজপুর বিরল উপজেলার ৪ নম্বর শহরগ্রাম ইউনিয়নের রামপুর রাঙ্গামাটি পাড়ায় একটি ভাটার মালিক মো. রশিদ। তার ভাষ্য, “আমার ইটভাটার প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আছে। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আমি ম্যানেজ করে চালাই।”

সেতাবগঞ্জ উপজেলার এই ভাটায় সবসময় পোড়ানো হয় কাঠ/ঢাকা ট্রিবিউন

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অবৈধ ভাটাগুলো পুরোদমে প্রস্তুত ও বিক্রি কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অধিকাংশ ইটভাটা পরিচালিত হয়। 

অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন (সংশোধিত) ২০১৯ অনুযায়ী, বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে।

অবৈধ ভাটা, অবৈধ গাড়ি

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রশাসনের চোখের সামনেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও ফসলের মাঠে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা। অধিকাংশ ভাটায় কয়লার বিপরীতে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। মাটি আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলি।

স্থানীয় কৃষক আতিউর রহমান বলেন, “আইন আছে, কিন্তু কেউ মানে না। প্রতি বছরের মতো এবারও ইট তৈরির মৌসুমে প্রতিদিন ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে ফসল ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।”

শত বছর ধরে তৈরি পলিমাটির বিনাশ

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, “হিমালয় পর্বত থেকে পানির সঙ্গে বয়ে আসা পলি মাটির স্তর তৈরি হতে ৫০ থেকে ১০০ বছর সময় লাগে। এই পলিমাটি আমাদের কৃষকদের জন্য আশির্বাদস্বরূপ। জমিতে উর্বর মাটির অনেক সংকট। অনেক রকম কীটনাশক সার বীজ ব্যবহারে জমির উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ পলি মাটি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ইট ভাটা, রাস্তা ভরাট, বাড়ির আঙিনা ইত্যাদি কাজে।”

তিনি আরও বলেন, “কৃষি জমিতে ইটভাটা নির্মাণের অনুমতি কৃষি বিভাগ থেকে দেওয়া হবে না। কৃষি জমিতে ইটভাটা করলে কৃষি জমির ফলন হ্রাস পায়।” এ বিষয়ে কৃষকদের পলি মাটি ব্যবহারে সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।

দিনাজপুর পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রুবায়েত আমিন রেজা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এ পর্যন্ত  মোট সাতটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সদর উপজেলায় দুটি ভাটাকে ২০ হাজার, পার্বতীপুরের তিনটিতে ছয় লাখ, চিরিরবন্দর উপজেলার দুটিতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।”

পর্যায়ক্রমে জেলা সব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।