“রেস্টুরেন্ট এলাকা” হিসেবে পরিচিত ঢাকার বেইলি রোডের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য বহুতল ভবন। এই ভবনগুলোর দিকে তাকালে চোখে পড়বে অসংখ্য রেস্টুরেন্টের সমাহার। তবে এসব ভবনের কোনোটিই রেস্টুরেন্ট ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি। রেস্টুরেন্ট ভাড়া দিতে হলে ভবনগুলোতে যতোটুকু সেফটি-সিকিউরিটি থাকা প্রয়োজন, কোনোটিতেই তা নেই। এরকম ভবনে থাকা রেস্টুরেন্ট কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বুঝিয়ে দিল বেইলি রোডের “গ্রিন কোজি কটেজ”।
“গ্রিন কোজি কটেজের” অদূরেই রয়েছে “বাইতুল আবেদীন শপিং সেন্টার” নামে একটি সাত তলা ভবন। নামে শপিং সেন্টার হলেও ভবনটির পুরোটা জুড়েই রয়েছে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট-দোকান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- “বার্গার এক্সপ্রেস”, “ক্যাফে জেলাটেরিয়া”, “সেশিয়েট”, “ওয়াসিস ক্যাফে এন্ড রেস্টুরেন্ট”সহ আরও বেশ কয়েকটি। এগুলোর প্রত্যেকটিতেই ব্যবহার হচ্ছে গ্যাসের বড় বড় সিলিন্ডার। ভবনটিতে ওঠা-নামার জন্য ব্যবহার হয় কেবল একটি সিঁড়ি, সেটাও বেশ সরু।
ভবনটিতে থাকা “ওয়াসিস ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের” ম্যানেজার মো. রাসেল এ বিষয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই ভবনে সেফটি-সিকিউরিটি ঘাটতি আছে, এটা সত্য। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই। ভবনের ম্যানেজারকে বারবার বলার পরও তারা এটা গুরুত্ব দেয় না। আর ভবনের মালিক তো আমার আওতার বাইরে। কারণ সবকিছুই ম্যানেজারই দেখেন।”
এই হোটেলকর্মী আরও বলেন, “আমি তো পেটের দায়ে এখানে চাকরি করি। মালিকপক্ষ যদি ভবনে সিকিউরিটি না দেয়, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না।”
ভবনের রেস্টুরেন্টগুলো লাইনের গ্যাস নাকি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে জানতে চাইলে রাসেল বলেন, “এই ভবনটির একপাশে লাইনের গ্যাস আছে, অন্য পাশে নেই। ওই পাশের রেস্টুরেন্টগুলো সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করে।”
“বার্গার এক্সপ্রেস” রেস্টুরেন্টের রান্না ঘরে উঁকি দিতেই দেখা গেল গ্যাসের বড় বড় সিলিন্ডার। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয়ে এই রেস্টুরেন্টের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে রেস্টুরেন্টটির ম্যানেজার দ্রুত বেরিয়ে যান। আর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেস্টুরেন্টটির ক্যাশ কাউন্টারের বসা এক কর্মী বলেন, “এখানে লাইনের গ্যাস না থাকায় আমরা সিলিন্ডার ব্যবহার করি। পাশের রেস্টুরেন্টে দুর্ঘটনা ঘটায় কিছুটা ভয় কাজ করছে। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই, চাকরি করি। তাই ঝুঁকির মধ্যেও কাজ করতে হচ্ছে।”
খোঁজ নিয়ে ভবনটির ম্যানেজার দাদনকে পাওয়া গেল। নিরাপত্তা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখানে কমবেশি সব ভবনে একইরকম। তাছাড়া আমরা রাজউকের সংশ্লিষ্ট সব নিয়ম মেনেই ভবন করেছি। রাজউকের নিয়ম মানা হলে সেফটি-সিকিউরিটি থাকবে না কেন?”
ভবনে শুধু একটি সরু সিঁড়ি কেন এমন প্রশ্ন শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে এই ম্যানেজার বলেন, “কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সবাই ওটা নিয়ে কয়দিন লাফালাফি করে। তারপর সব আবার ঠিক হয়ে যায়। এটাও বেশি সময় থাকবে না।” “ভবন মালিকের নাম কী, শপিং সেন্টারের ভবনে রেস্টুরেন্ট কেন”- এমন প্রশ্ন করতেই “পরে কথা বলব” বলে দ্রুত পাশের বিল্ডিং “ওরিয়েন্টাল ওরচিড”-এ উঠে যান এই ম্যানেজার।
এই শপিং সেন্টারটির বিপরীতে (সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের বিপরীতে) আছে আরেকটি চারতলা ভবন। ভবনটির দোতলা এবং তিনতলাজুড়ে আছে “সুলতান’স ডাইন” রেস্টুরেন্ট। এছাড়াও “প্যারাডাইস ফ্রুটস জুস বার” নামে ছোট একটি খাবারের দোকানও আছে। এখানেও তেমন সেফটি-সিকিউরিটি চোখে পড়েনি। এই ভবনের রেস্টুরেন্টগুলোও পুরোপুরি সিলিন্ডার নির্ভর। ভবনটিতে বেশ কয়েকটি বড় বড় সিলিন্ডারও দেখা যায়।
গ্রিন কোজি কটেজের একেবারে পাশেই অবস্থিত ১৩ তলা বিশিষ্ট “গোল্ড প্যালেস”। এটি “ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড” নামেও খ্যাত। এই ভবনে তিনটি রেস্টুরেন্ট আছে। “কেএফসি”, “পিৎজা হাট” ও “থার্টি থ্রি” রেস্টুরেন্ট। এই ভবনটিতে তুলনামূলক সেফটি-সিকিউরিটি ব্যবস্থা ঠিক দেখা গেছে। তবে পাশের ভবনে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে রেস্টুরেন্টগুলো। ভবনটিতে ওঠানামা নামার জন্য লিফট ছাড়াও তিনটি সিঁড়ি দেখা গেছে। এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও দেখা গেছে।
বেইলি রোডে “নবাবি ভোজ ১”, “নবাবি ভোজ ২”, “ক্যাপিটাল”, “পিঠাঘর অ্যান্ড জ্যাগেরী রেস্টুরেন্ট”, “চিন চিন চাইনিজ”, “তাওয়া রেস্টুরেন্ট”, “ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি অ্যান্ড কাবাব”, “ঢাকাইয়া কাবাব অ্যান্ড স্যুপ” যেই ভবনগুলোতে, সেগুলোতেও তেমন কোনো অগ্নিনিরাপত্তা চোখে পড়েনি। তবে কয়েকটি রেস্টুরেন্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
মুবিন নামে একজন খেতে এসেছিলেন “ক্যাফে জেলাটেরিয়ায়”। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের সবসময় রেস্টুরেন্টে আসা হয় না। যখন ছুটি পাই তখন পরিবার নিয়ে ভালো রেস্টুরেন্টে একবার হয়তো আসা হয়। এখন সেখানেও যদি এমন জীবনের শঙ্কা থাকে তাহলে তো না আসাই ভালো। যেকোনো ভবনে রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সঠিকভাবে তদারকি করা দরকার। নয়তো বেইলি রোডের এই দুর্ঘটনার মতো আরও দুর্ঘটনার সাক্ষী হতে হবে আমাদের।”
বাণিজ্যিক ভবনে রেস্টুরেন্ট কী ধরনের ঝুঁকি থাকে জানতে চাইলে স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, “রেস্টুরেন্ট আর অফিস ভবনের নকশা এক হতে পারে না। একটি ভবনের নকশা করা হয় তার ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে। কোনো ভবন অফিসের জন্য তৈরি করে রেস্টুরেন্টের জন্য ভাড়া দেওয়া হলে, সাধারণ মানুষ তো এতকিছু বোঝে না যে বিপদ হলে কী হতে পারে। তারা নামি-দামি রেস্টুরেন্ট দেখে সেখানে যায়।”
রেস্টুরেন্টে চুলা ও সিলিন্ডারের ব্যবহার থাকায় বহুতল ভবনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য স্পেস বা জায়গা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এই স্থপতি।
যেখানে সেখানে রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠার বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, “সমিতির পক্ষ থেকে আমরা সব সময় সব ধরনের নিরাপত্তা মেনে ব্যবসা করা কথা বলে আসছি। কিন্তু অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক এসব নিয়ম-কানুনের কোনো তোয়াক্কা করে না। কোজি কটেজের রেস্টুরেন্টগুলোও তাই করেছে। তারা কিন্তু আমাদের সমিতির সদস্য নয়।”
রেস্টুরেন্টগুলোতে সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার কমিয়ে সরকারি সহযোগিতায় পাইপলাইনের গ্যাসের বিষয়ে জোর দেন ইমরান।
বাণিজ্যিক ভবনে রেস্টুরেন্টের বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, “বেইলি রোডে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, এরকম ঘটনা আবার না ঘটুক; এটাই আমরা চাই। কোথাও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে শুধু নোটিশ না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ত্রুটি থাকলে সরকার ব্যবস্থা নেবে। সেটা যদি কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হয় তবে ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে, আর যদি কোনো সংস্থা বা ভবন মালিকের বিরুদ্ধে হয় তবে সেটা তার বিরুদ্ধে। সবকিছু বাণিজ্যিকীকরণ করা হবে আর সেটার মাধ্যমে মানুষের জীবন চলে যাবে, এটা হতে পারে না।”