দখলে বিলীন বুড়িগঙ্গার ১৬ কিলোমিটার, প্রবাহ ফেরাতে পাঁচ সুপারিশ

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর অন্তত ১৬ কিলোমিটার এলাকা ভরাট, দখল ও প্রবাহশূন্যতার শিকার হয়ে বিলীন হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন গবেষকরা।

তারা বলছেন, বুড়িগঙ্গা নদীর সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার বিলীন হয়েছে। বাকি ২৫ কিলোমিটার প্রবহমান রয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মার্চ) ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে আয়োজিত ‘‘বুড়িগঙ্গা: নিরুদ্ধ নদীর পুনরুদ্ধার শীর্ষক’’ গবেষণা ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধান গবেষক ও নদীরক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই গবেষণা চালানো হয়েছে। গবেষণায় জিপিএস ট্র্যাকিং ও সিএস ম্যাপ ব্যবহার ছাড়াও সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি। গবেষণা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস), রিভারাইন পিপল, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), দ্য ডেইলি স্টার ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।

এতে বলা হয়, বুড়িগঙ্গার প্রকৃত উৎসমুখ, প্রকৃত দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। যেমন পাউবো নদীটির দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার, বিআইডব্লিউটিএ ৪৫ কিলোমিটার, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২৯ কিলোমিটার, পর্যটন কর্পোরেশন ২৭ কিলোমিটার উল্লেখ করেছে। এই গবেষণায় জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার প্রকৃত দৈর্ঘ্য নিরূপণ করা গেছে।

দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নে ধলেশ্বরীর উৎপত্তিস্থল থেকে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের জাজিরার কাছ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার। এই দৈর্ঘ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলিতে উল্লিখিত দৈর্ঘ্যের সমান। ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত ভরাট, দখল ও প্রবাহশূন্যতার শিকার বুড়িগঙ্গার অন্তত ১৬ কিলোমিটার প্রবাহপথ পাউবো, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ ভুলে গিয়েছিল।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্ষাকালে সদরঘাটে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম/লিটার অক্সিজেন পাওয়া গেছে। গ্রীষ্মকালে দ্রবীভূত অক্সিজেন ৩-এর নিচে, শীত ও বসন্তে ২-এর নিচে এবং হেমন্তে ১-এর নিচে নেমে আসে। গবেষণায় নদীর দুই তীরে ১০০টি ড্রেন এবং দুই তীর ঘেঁষে কারখানা, ইটভাটাসহ ২৫০টি স্থাপনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গার প্রবহমান অংশের দুই পাশে শুধু সীমান্তখুঁটি রয়েছে। ভরাট, দখল ও শুকনো অংশে খুঁটি নেই। ১,০৯২টি খুঁটি পাওয়া গেলেও সেগুলোর মাত্র ২৬০টি যথাযথ রয়েছে। ৭১৮টি খুঁটি ভাঙা এবং ১১৪টির অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।  

এতে বলা হয়, বুড়িগঙ্গা অববাহিকায় ভূমিরূপের পরিবর্তন বোঝার জন্য এই গবেষণায় ১৯৯০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছর ব্যবধানের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চারটি ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহৃত সূচক এক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয়েছিল- নিম্নভূমি, বসতি, সবুজাঞ্চল, জলাভূমি। বুড়িগঙ্গা নদীপ্রবাহের দুই পাশে দুই কিলোমিটার বাফার এরিয়া ধরে এর অববাহিকা ৫৩৬ বর্গকিলেমিটার নির্ধারিত হয়েছে।

এছাড়াও গবেষণাটিতে বলা হয়, ১৯৯০ সালে বুড়িগঙ্গা অববাহিকার সবুজাঞ্চল ১৯৯০ সালের আগে ছিল প্রায় ৩৩.৭৬%। নতুন নতুন বসতি শুরু হলে ওই বছরই সেটা কমে ৩২.৯৪% হয়। এ সময় নিম্নভূমি ছিল ২০.৬৭%, সবুজাঞ্চলের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রায়। কিন্তু ২০২০ সালে এসে সবুজাঞ্চল কমে ২৩%-এ দাঁড়ায়; অন্যদিকে বসতি ও নিম্নভূমি বেড়ে যথাক্রমে কমবেশি ৩৫% ও ২৮%-এ দাঁড়ায়। এরপর থেকে সবুজাঞ্চল হ্রাস এবং বসতি ও নিম্নভূমির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে।

২০২০ সালে এসে দেখা যায়, নিম্নভূমি যেমন ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে; তেমনই ব্যাপক মাত্রায় কমেছে সবুজাঞ্চল ও জলাভূমি। নিম্নভূমি ১৯৯০ সালের ২০.৬৭% থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৩৬.৪৩%-এ দাঁড়ায়। অর্থ্যাৎ গত ৩০ বছরে নদীর অববাহিকায় নিম্নভূমি বেড়েছে ১৫.৭৬%। সবুজাঞ্চল ১৯৯০ সালের ৩৩.৩৭% থেকে কমে ২০২০ সালে ১৮.৭৬%-এ দাঁড়ায়।

এর অর্থ দাঁড়ায়, বুড়িগঙ্গা অববাহিকায় সবুজাঞ্চল ও জলাভূমি ক্রমবর্ধমান হারে নিম্নভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে নতুন বসতি স্থাপিত হয়েছে।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সভাপ্রধান ছিলেন ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলম, আলোচক ছিলেন বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ। ভিডিও বার্তায় পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘‘যখনই আমরা নদী আন্দোলন করি, তখনই সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়। বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে এত প্রকল্প রয়েছে; তারপরও আমরা আগের অবস্থায় ফিরতে দেখলাম না।’’