পৃথিবীর দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। এ কারণে প্রায়ই প্রলয়ঙ্কারী বন্যা থেকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় (মৌসুমি) ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে দেশ।
আশার কথা হলো, দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় তৎপর বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। আসতে শুরু করেছে সুফলও। কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে দুর্যোগের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা। দুর্যোগে নারীদের মৃত্যুও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
একসময় দেশে দুর্যোগ হলে পুরুষের তুলনায় বহুসংখ্যক নারীদের মৃত্যু হতো। কিন্তু এখন সেই দুরাবস্থা থেকে অনেকাংশে রেহাই পেয়েছেন নারীরা। স্বাধীনতার আগে দেশে দুর্যোগের পূর্ব সতর্কতা জারি কিংবা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গতিপথ জানার ব্যবস্থা ছিল না। ১৯৭০ সালে এক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে ভোলায় তিন লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই দুর্যোগে প্রতি একজন পুরুষের বিপরীতে নিহত হন ১৪ জন নারী।
৩৭ বছর পর দেশের দক্ষিণাঞ্চল মুখোমুখি হয় আরেক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের। মারা যান ৩,৫০০ মানুষ। এ দফায় প্রতিজন পুরুষের বিপরীতে মৃত্যু হয় পাঁচজন নারীর।
সম্প্রতি দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ত্রাণ সচিব মো. কামরুল হাসান জানান, বর্তমানে দুর্যোগে নারী-পুরুষের মৃত্যুর হার সমান।
সন্তুষ্টির সুযোগ আছে?
১৯৯৭ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ মার্চ দেশে পালিত হয়ে আসছে দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস। এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা বয়ে এনেছে বহু সাফল্য, যা আজও চলমান। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ এখনও সাম্য অর্জনে পথ অনেক বাকি।
বহু বছর ধরে লৈঙ্গিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছেন দিলরুবা হায়দার। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এখনও নারীদের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচ্ছন্ন থাকার সুযোগও থাকে না নারীদের।
এই নারী অধিকার কর্মী বলেন, কোথাও কোথাও ব্যবস্থা থাকলেও তা সবসময় ব্যবহারের সুযোগ পান না নারী ও মেয়ে শিশুরা।
দিলরুবা বলেন, দেশের দুর্যোগ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে বেশকিছু ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করে। কিন্তু বন্যাকবলিত এলাকায় এসব কমিটিতে থাকা নারীদের বেশিরভাগই এ সম্পর্কে জানেন না। স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল নন।
সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভলপমেন্টের (সিডিডি) ডেপুটি ডিরেক্টর ব্রজ গোপাল সাহার মতে, দুর্যোগকবলিত এলাকায় বসবাসরত পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা এমন প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে শুরুতেই দুর্যোগের খবর পৌঁছায় না। তিনি মনে করেন দুর্যোগের প্রস্তুতি হওয়া উচিত আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতার শিকার জনগোষ্ঠীর কাছে অডিও ও ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে খবর পৌঁছানো প্রয়োজন।
সচিব কামরুল ইসলাম আশ্বাস দিয়ে বলেন, দেশে এখন প্রায় পাঁচ হাজার সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। নারী ও শিশুদের জন্য সেগুলোর পরিবেশ উপযোগী করে তোলার কাজ চলছে।
“আমরা এখন বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করছি।”
দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবসে ব্র্যাক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির পরিচালক লিয়াকত আলী বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ প্রায় তিনশ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মোকাবিলা করেছে। এতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ক্ষতি হয়েছে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণ সম্পদের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো দেশের সব এলাকায় পুরোপুরি সক্রিয় নয়। কারণ হিসেবে আর্থিক অসঙ্গতিকে দায়ী করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের সামাজিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিশিয়া ফার্নাদেজের মতে, “নারীর অংশগ্রহণ যেকোনো সমস্যার নানাবিধ সমাধান দিতে পারে। ফিলিপাইনে সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিষয়ক কমিটিতে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এই কমিটি দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং সামাজিক বিনিয়োগে ভূমিকা রাখে।”