ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি এবং দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করার কারণে ঢাকার হাতিরঝিল এখন মশা উৎপাদনের সবচেয়ে বড় জায়গা। একই অবস্থা উত্তরা খাল, গুলশান ও বারিধারা লেকেরও।
এ চারটি জলাধারের মালিক রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) হলেও দীর্ঘদিন ধরে এগুলো পরিষ্কারের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না সংস্থাটি।
রাজউকের উদাসীনতা এবং স্থানীয় জনসাধারণের ভোগান্তির কারণে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এখন এসব লেক ও খালে পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধনে অভিযান চালাচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাতিরঝিলের উভয় তীরে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যার পানি থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে ডিএনসিসি এখানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালালেও এরপর প্রায় দুই বছরে হাতিরঝিল পরিষ্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা গত তিন বছরে খাল পরিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গুলশান ও বারিধারা লেকের অবস্থাও শোচনীয়।
গুলশান ও বারিধারা লেকের পাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, পাশেই গুলশান জামে মসজিদ। মসজিদের মুসল্লিরা জানান-লেকের দূষিত পানির দুর্গন্ধ মসজিদে আসে। দুর্গন্ধে টেকা যায় না। গুলশান সোসাইটি ও বারিধারা সোসাইটির নেতারা এ পরিস্থিতিতে ডিএনসিসি মেয়রের কাছে আবেদন জানালে গত মাসে এ লেক দুটি পরিষ্কার করা হয়।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, হাতিরঝিল, উত্তরা খাল, গুলশান লেক ও বারিধারা লেক রাজউকের মালিকানাধীন হলেও ডিএনসিসিকেই এগুলো পরিষ্কার করতে হয়।
ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফিদা হাসান বলেন, ‘‘আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে কিউলেক্স মশা নিধনে আমরা খাল ও জলাধার পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করেছি। কিন্তু এ এলাকায় রাজউকের মালিকানাধীন জলাধারগুলো তারা পরিষ্কার না করায় মানুষের ভোগান্তি বিবেচনায় নিয়ে ডিএনসিসি থেকে পরিষ্কার করা হচ্ছে।’’
ফিদা হাসান জানান, ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি গুলশান ও বারিধারা সোসাইটি, স্থানীয় ছয়টি স্কুলের শিক্ষার্থী এবং কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহযোগিতায় এসব পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়েছে।
রাজউক বলছে, হাতিরঝিলসহ তাদের মালিকানাধীন জলাধারগুলোতে দুর্গন্ধ দূর করতে মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও কখনও বড় আকারে পরিচ্ছন্নতার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া সামনের ডেঙ্গু মৌসুমের আগেও এসব জলাধার পরিষ্কার করতে রাজউকের কোনো কর্মসূচি নেই বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মো. কামরুল ইসলাম জানান, হাতিরঝিলের পানি পরিষ্কার রাখতে নিয়মিতই ওষুধ ছিটানো হয়। এ ছাড়া রাজউকের মালিকানাধীন অন্যান্য জলাধারে দুর্গন্ধ হলে সেখানেও কেমিক্যাল ছিটানো হয়। এর বাইরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনও উদ্যোগ রাজউকের নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক ড. কবিরুল বাসার বলেন, ‘‘খাল ও লেক পরিষ্কার না করায় এসব এলাকায় ডেঙ্গু মৌসুমে ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর বাইরে দুর্গন্ধযুক্ত দূষিত এসব পানি জীববৈচিত্র্য ও শহরের পরিবেশের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।’’
ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, উত্তরা খাল এবং গুলশান ও বারিধারা লেক ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তর করে দেওয়ার জন্য রাজউককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো রাজউকের অধীনে থাকায় ডিএনসিসি চাইলেই নিজেদের মতো করে পরিষ্কার করতে পারছে না।
তিনি বলেন, ‘‘খাল ও লেকগুলো আমাদের হস্তান্তর করলে এগুলো পরিষ্কার করে নান্দনিক পরিবেশ করার পরিকল্পনা আছে। এখানে ওয়াটার বোট চলবে, মাছের চাষও সম্ভব হবে। কিন্তু তার জন্য অবশ্যই পয়ঃবর্জ্যের দূষিত পানি খালে আসা বন্ধ করতে হবে। ওয়াসা ও রাজউককে এগিয়ে আসতে হবে। সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’’