রানা প্লাজা ধসের ১১ বছর: দুর্বিষহ দিনযাপন, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের সকাল। প্রতিদিনের মতো কাজে এসেছিলেন শ্রমিকরা। হঠাৎ বিকট আওয়াজ। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজার আটতলা ভবনের পুরোটাই। প্রাণ হারান ১,১৩৬ জন শ্রমিক। মুহূর্তের ওই ঘটনার ১১ বছর পরেও সেদিনের ঘটনায় আতঙ্কিত হন বেঁচে ফেরা মানুষেরা। তাদের দাবি, এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সুষ্ঠু বিচার।

ফিরে দেখা ২৪ এপ্রিল, ২০১৩

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিল রানা প্লাজা। ভবনের প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান। দ্বিতীয় তলায় দোকান ও ব্যাংকের শাখা। তৃতীয় থেকে সপ্তম তলায় ছিল পোশাক কারখানা। এর মধ্যে তৃতীয় তলায় নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডে এবং ফ্যানটম ট্যাগ লিমিটেড, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ইথারটেক্স লিমিটেড গার্মেন্টস। অষ্টম ও নবম তলা ছিল ফাঁকা।

সেদিন সকালে ভবনে কাজ করছিল প্রায় তিন হাজার শ্রমিক। আটটার দিকেই কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছিল। বেলা সাড়ে ৯টার দিকে বিকট শব্দে প্রথম তলার ওপরে পুরো ভবন ধসে পড়ে।

রানা প্লাজা ধ্বংসস্তুপে উদ্ধারাভিযান/মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

এর পরপরই শুরু হয় উদ্ধার কাজ। শুরুতে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। দ্রুত সময়ে উদ্ধার কাজে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র‌্যাব ও পুলিশ।

এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত

ধসের একদিন আগেই ভবনটির চার ও পাঁচ তলার কয়েকটি পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এ কারণে শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন। খবর পেয়ে সেখানে গেলে মালিকপক্ষ স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। সাংবাদিকরা তখন যোগাযোগ করেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে খবর প্রকাশ হয় সংবাদমাধ্যম।

বিকেলের দিকে সাভারের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কবির হোসেন সরদার ভবনের ফাটল পরিদর্শন করেন। এরপর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের বলেন, “এ ফাটলে তেমন কোনো সমস্যা নেই, বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নেই। সামান্য প্লাস্টার উঠে গেছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।” 

এরপর ইউএনও চলে যান।

ইউএনওর সেই কথিত আশ্বাসের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভবন ধসের সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। প্রাণ হারায় হাজারো শ্রমিক। নড়ে ওঠে বিশ্বের বিবেক। ওই ঘটনার পরেই ইউএনওকে বদলি করে দায় এড়ায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

রানা প্লাজার ভয়াল স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে শ্রমিকদের/ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

আহত শ্রমিক, শ্রমিক নেতা ও সুশীল সমাজের দাবি, প্রশাসন যথাযথ তৎপরতা রাখলে হয়তো এমন ঘটনা এড়ানো যেত।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, মৃত লাশের গন্ধের সাক্ষী অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ

ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে একে একে উদ্ধার হতে থাকে জীবিত, আহত, মৃত মানুষের দেহ। আহতদের নেওয়া হয় আশপাশের হাসপাতালে। মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে।

টানা ১৭ দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হতো ওই মাঠে। লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা ছুটে আসতেন সাইরেন শুনলেই। এই বুঝি স্বজনের মরদেহ এলো! স্বজনদের আহাজারিতে দিনরাত ভারি হয়ে থাকত অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ।

প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের পুরোটা জুড়েই তখন কান্না আর সাইরেনের আওয়াজ। অধরচন্দ্রের মাঠ এখনও বয়ে বেড়ায় সেই স্মৃতি।

ওই সময় স্কুলটিতে পড়তেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, “আগে ক্লাসের বাইরেও প্রচুর ঘুরাফেরা, খেলাধুলা করতাম এই মাঠে। কিন্তু রানা প্লাজার ধসে পড়ার পর মৃত লাশগুলো সারি সারি করে রাখা হয়েছিল এখানে। এখনও গা ছমছম করে ওঠে।”

হতাহত যত

প্রায় ১৭ দিনের উদ্ধার অভিযানে রানা প্লাজার ভবন থেকে ১,১৩৬ জন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল ২,৪৩৮ জন শ্রমিককে।

অধর চন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঠ/ঢাকা ট্রিবিউন

আহতদের অনেকেই এখনও দুর্বিষহ সেইদিনের স্মৃতি বয়ে বেরাচ্ছেন। অনেকেই পঙ্গু। এখনও সেই ভয়াল স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।

শহিদ বেদি এখন ‘প্রতিবাদের প্রতীক’

হতভাগ্য শ্রমিকদের স্মরণে ২০১৩ সালের ২৪ মে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি শহদ বেদি নির্মাণ করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

অস্থায়ী শহিদ বেদিটির নামকরণ করা হয় “প্রতিবাদ-প্রতিরোধ”।

বেদিটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন চালিয়ে আসছে নানা কর্মসূচি। এটি এখন হয়ে উঠেছে “প্রতিবাদের প্রতীক”।

এখন যেমন আছে রানা প্লাজার সেই স্থান

ধসের পরপরই প্রায় সব ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এরপর জমিটির চারপাশ কাঁটাতার ও টিনের বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময় প্রায় প্রতিদিনই রানা প্লাজায় আহত, নিহত আর নিখোঁজ স্বজনরা জায়গাটিতে আসতেন। তবে ধীরে ধীরে জায়গাটি পরিণত হয় পরিত্যক্ত ভূমিতে।

রানা প্লাজায় নিহত স্বজনকে ফুল দিয়ে স্মরণ/মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

বর্তমানে জায়গাটিতে নানা লতাপাতার দখল। সামনে বেদি। ফুটপাত জুড়ে রাখা থাকে রেন্ট-এ কারের গাড়ি। তবে ২৪ এপ্রিল এলে নানা কর্মসূচিতে কিছুটা প্রাণ পায় জায়গাটি।

বিচার পাননি হতভাগ্যরা

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের মৃত্যুতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে আরেকটি মামলা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তিনটি মামলার কোনোটিই এখনও শেষ হয়নি। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইনের মামলাটি দীর্ঘদিন হাইকোর্টে স্থগিত। এটি বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। ‘‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’’ অভিযোগে পুলিশের করা মামলাটি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। আর ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

এসব দীর্ঘসূত্রিতার হাজারো শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ওই ঘটনায় এখনও বিচার পাননি হতভাগ্যরা।

২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। তবে চার মাসেও এ নির্দেশের অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

বাঁচার লড়াই করছেন আহতরা

প্রায় ১১ বছর ধরে পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচার লড়াই করে যাচ্ছেন অনেকেই। অসুস্থতা আর দারিদ্র্য নিয়ে তাদের দীর্ঘ সংগ্রাম। কেউ তাদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। শ্রমিক নেতারাও রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ দোষীদের শাস্তি ও শ্রমিকদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন এতদিন।

রানা প্লাজার একটি কারখানার সুইং অপারেটর নীলুফা বেগম ধসে পড়ার ঘটনায় গুরুতর আহত। এগারো বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন পায়ের ক্ষত। সুচিকিৎসার অভাবে সইছেন অবিরাম যাতনা।

নীলুফা বেগম বলেন, “আমার একটা পা মারাত্মক জখম। অপারেশন করা লাগছে। পা কেটেও ফেলতে চাইছি। কিন্তু অপারেশনের টাকা নাই। ক্ষতিপূরণ পাইছি মাত্র ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এটা কি কোনো ক্ষতিপূরণ হতে পারে? আজ পর্যন্ত বায়ার, মালিক কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কোন খোঁজখবর কেউ রাখেনি। বিনা চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছে।”

রানা প্লাজা ধসের ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন শ্রমিক তাসলিমা/ঢাকা ট্রিবিউন

বর্তমানে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “রানা প্লাজা ভাঙার পর আমি স্বামী হারাইছি। আমার চিন্তায় মাও স্ট্রোক করে মারা গেছে। ছেলে নতুন কাপড় কেনার জন্য টাকা চাইছে। কিন্তু কিভাবে দেব আমি? ছেলেটাকে পড়াতেও পারি নাই।”

আহত আরেক শ্রমিক মনির হোসেন বলেন, “রানা প্লাজা ধসের মধ্যে পড়ে তিন দিন আটকা ছিলাম। কোমর, হাত, পায়ে আঘাত পাই। চারতলায় ছিলাম, ফ্যানটম ট্যাগ লিমিটেড কারখানায় কাজ করতাম। তবে এত বছরেও কোনো পুনর্বাসন পাইনি। কোনো টাকাও পাইনি। কিছু দিন আগেও অসুস্থ হয়ে পড়ি। এনাম মেডিকেলে ভর্তি ছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাইনি। নিজের টাকা খরচ করে চিকিৎসা করাচ্ছি। পরিবার নিয়ে খুব অসহায় অবস্থায় আছি। এতো দিন মুদি দোকান করেছি। এখন কিছু করতে পারি না। রানা প্লাজার ওই ঘটনায় আমার সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনও প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি।”

তিনি বলেন, “আমরা চাই আমাদের অন্তত চিকিৎসাটাই দেওয়া হোক। আর পুনর্বাসন করা হোক।”

যা বলছেন শ্রমিক নেতারা

রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর প্রায় প্রতিটি শ্রমিক সংগঠনই নড়েচড়ে বসে। শ্রমিকদের কর্ম পরিবেশ নিরাপদ রাখতে আন্দোলন শুরু করে। নিহত ও আহতদের লস অব আর্নিংয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করার জোর দাবি তোলেন তারা।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস আ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “অনেক শ্রমিক এখনও চিকিৎসা পাচ্ছে না। আমরা চাই তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই হত্যার বিচার যাতে অবিলম্বে শেষ হয়। এছাড়া বর্তমানে রানা প্লাজার জায়গাটি নোংরা হয়ে আছে। ময়লা ফেলা হচ্ছে। সরকার ও পৌরসভার কাছে জায়গাটি পরিষ্কারের দাবি জানিয়েছি। এই জায়গায় আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছরে এসেও আমাদের দাবি যেগুলো ছিলো তার কিছুই পূরণ হয়নি। চিকিৎসা আর পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবার গুলো মানবেতর দিন পার করছে। আমরা তাদের পুনর্বাসন ও সোহেল রানাসহ জড়িতদের বিচারের দাবি জানাই।”