পরিবেশের নিরাপত্তায় ‘থ্রি জিরো’ নীতি মেনে চলার আহ্বান ড. ইউনূসের

একটি নতুন সভ্যতা, একটি আত্মসংরক্ষিত এবং আত্ম-শক্তিশালী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপনে বুদ্ধিবৃত্তিক, আর্থিক ও যুব শক্তিকে একত্রিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

বুধবার (১৩ নভেম্বর) আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলনের বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘‘জলবায়ু সংকট তীব্রতর হচ্ছে। আমরা আত্ম-ধ্বংসাত্মক মূল্যবোধের লালন অব্যাহত রাখায় আমাদের সভ্যতা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’’

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ দুই দিনের ওয়ার্ল্ড লিডারস ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে (ডাব্লুএলসিএএস) অংশ নিতে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (কপ২৯) পক্ষগুলোর ২৯তম সম্মেলন ১১-২২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

ভিন্ন দৃষ্টিকোণে ‘‘জলবায়ু বিপর্যয়কে’’ উপস্থাপন করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘‘পরিবেশের নিরাপত্তার জন্য নতুন জীবনধারা প্রয়োজন। যা চাপিয়ে দেওয়া হবে না, তবে এটি একটি পছন্দ হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘তরুণরা এই জীবনধারাকে পছন্দ করে। প্রতিটি তরুণ ৩ শূন্য ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে উঠবে- শূন্য নীট কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদের কেন্দ্রীকরণ, শুধুমাত্র সামাজিক ব্যবসা গড়ে তোলার মাধ্যমে এবং নিজেদেরকে উদ্যোক্তায় পরিণত করে শূন্য বেকারত্ব।’’

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বলেন, “প্রতিটি মানুষ ‘থ্রি জিরো’ ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে উঠবে এবং তিনি সারা জীবন এই নীতিতেই থাকবেন এবং এটি নতুন সভ্যতা গড়ে তুলবে।”

অন্যরাও তার এই স্বপ্নে যোগ দেবেন এমন আশা প্রকাশ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘‘এটা করা যেতে পারে। আমাদের যা করতে হবে তা হলো গ্রহ এবং এতে বসবাসকারী সকলের সুরক্ষায় সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন জীবনধারা গ্রহণ করা। বাকিটা আজকের প্রজন্মই করবে। তারা তাদের গ্রহকে ভালোবাসে।’’

তিন শূন্যের নতুন পৃথিবী গড়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্নের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যদি একসঙ্গে স্বপ্ন দেখি, তাহলে তা হবেই।”

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জলবায়ু ধ্বংস রোধ করা থেকে শুরু করে আরও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার দিকে নিয়ে যাবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এই গ্রহের মানব বাসিন্দারাই পৃথিবী ধ্বংসের জন্য দায়ী।”

তিনি বলেন, “আমরা এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করছি। আমরা এমন একটি জীবনধারা বেছে নিয়েছি যা পরিবেশের বিরুদ্ধে কাজ করে। আমরা এটিকে একটি অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ন্যায্যতা দিচ্ছি, যা গ্রহের সিস্টেমের মতো প্রাকৃতিক হিসাবে বিবেচিত হয়।’’

তিনি বলেন, “মুনাফার সর্বোচ্চ বৃদ্ধিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যা সিস্টেমের সমস্ত কিছুকে আমাদের ইচ্ছা অনুসারে তার ভূমিকা পালন করতে দেয়।”

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “টিকে থাকতে হলে বিশ্বকে আরেকটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে- একটি পাল্টা সংস্কৃতি যা ভিন্ন জীবনধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।”

তিনি বলেন, ‘‘এটি শূন্য বর্জ্যের উপর ভিত্তি করে। এটি প্রয়োজনীয় চাহিদার মধ্যে খরচ সীমাবদ্ধ করবে, কোনো অবশিষ্ট বর্জ্য রাখবে না। এই জীবনধারাও শূন্য কার্বনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি নেই। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি।’ এটা এমন একটি অর্থনীতি হবে, যা প্রাথমিকভাবে শূন্য ব্যক্তিগত মুনাফা– সামাজিক ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।”

এই ব্যবসাকে সামাজিক এবং পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অ-লাভজনক ব্যবসা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, কপ-২৯ চলাকালীন আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের ডাব্লুএলসিএএস-এ আমন্ত্রণ বিশ্ব নেতাদের জড়িত হওয়া এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়ানো। এটি  নির্গমন হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণ, জলবায়ু সম্পর্কিত মূল সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন ও রূপান্তর করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ এবং বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনায় রূপান্তর করার গুরুত্বকে তুলে ধরে।