খুলনা অঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে এইডস শনাক্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা। বাদ পড়ছে না শিশু এবং ট্রান্সজেন্ডারও। এ পর্যন্ত এইডস পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ৯২৬ জনের, যার মধ্যে ৭ জন ট্রান্সজেন্ডার। আর এ বছরই শনাক্ত হয়েছে ১০৮ জনের যার মধ্যে কোনো ট্রান্সজেন্ডার নেই। এইডস আক্রান্ত হয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছেন শিশুসহ ২৭ জন। মৃতের মধ্যে ১২ জন এ বছর শনাক্ত হয়েছিলেন। যৌনতার কারণে এর পজিটিভ শনাক্তের হার ৯০%। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সব ধরনের পরীক্ষার সঙ্গে এইডস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।
২০২০ সালে খুলনা অঞ্চলে এইচআইভি পজিটিভ ছিল ৩৬ জন আর ভাইরাসটি আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৭ জন। ২০২১ সালে খুলনা অঞ্চলে শনাক্তের সংখ্যা ছিল ২৮ জন, মারা যায় ৫ জন। ২০২২ সালে এর সংখ্যা ছিল ৬৫ জন, মারা যায় ৮ জন। ২০২৩ সালে পজিটিভ ছিল ৭১ জন, মারা যায় ২৫ জন। ২০২৪ সালে এসে পজিটিভ হয় ১০৮ জন আর মারা গেছেন ২৭ জন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে অ্যান্টি রেক্ট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এ সেন্টারে শিশুসহ ১,৫৪৭ জনের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। যার মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয় শিশুসহ ৮৩ জনের। এদের মধ্যে পুরুষ ৫৯ জন এবং নারী ২৪ জন। এই সেন্টারে পজিটিভ শনাক্তের মধ্যে খুলনার ৩০ জন, বাগেরহাটের ১৪ জন, নড়াইলের ৯ জন, যশোরের ১০ জন, সাতক্ষীরার ৭, ঝিনাইদহে ২ জন, মাগুরায় ১ জন, বরিশালে ১ জন, বরগুনায় ১ জন, পিরোজপুরে ৪ জন, পটুয়াখালীতে ১ জন, গোপালগঞ্জে ২ জন, শরিয়তপুরে ১ জন রয়েছেন। নতুন শনাক্ত ৮৩ জনের মধ্যে যৌনতায় ৫৪ জন, সমকামী ৩৬ জন, পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে পজিটিভ হয় আরও ১০ জন। এছাড়াও মায়ের গর্ভ থেকে ৩ জন। এই ৮৩ জনের মধ্যে ৭৫ জন ওষুধ গ্রহণ শুরু করেছেন। বাকী ৮ জন এখনও ওষুধ গ্রহণ শুরু করেনি। এ সময় মারা গেছেন আরও ২২ জন। এর মধ্যে এ বছর শনাক্ত ৮৩ জনের ১২ জন রয়েছেন। বাকী ১০ জন পুরনো পজিটিভ।
যশোর এআরটি সেন্টার থেকে জানা যায়, ৪,১০২ জনের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ২৫ জন শনাক্ত হয়। এর মধ্যে পায়ুপথে যৌনতা থেকে ১২ জন, সমকামী ২ জন রয়েছে। এ সেন্টারের আওতায় মোট শনাক্ত ১৮৫ জনকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মারা গেছেন ৫ জন। এর মধ্যে একজন ১৩ বছরের শিশু রয়েছে। শিশুটির মৃত পিতা-মাতাও এইচআইভি পজিটিভ ছিলেন। যশোর এআরটির আওতায় যশোরে ১১০ জন, নড়াইলে ২২ জন, ঝিনাইদহে ১৮ জন, মাগুরায় ১৩ জন, সাতক্ষীরায় ৮ জন, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গায় ৫ জন, মেহেরপুরে ৩ জন ও বাগেরহাটে ১ জন এইচআইভি/এইডস পজিটিভ শনাক্ত রয়েছে।
খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে ২০২২ এর নভেম্বর থেকে ২০২৩ এর অক্টোবর পর্যন্ত শিশুসহ ৭১ জনের নমুনায় এইডস শনাক্ত হয়েছিল। এ সময়ে এই জীবাণু বহনকারী শিশুসহ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২১ এর নভেম্বর থেকে ২০২২ এর অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে এইডস শনাক্ত হয়েছিল শিশুসহ ৬৫ জনের। মৃত্যু হয় শিশুসহ ১৮ জনের। এ সময়ে খুলনা জেলায় ২ শিশুসহ শনাক্ত হয় ২৮ জন এবং মৃত্যু হয় শিশুসহ ৮ জনের।
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে ১৫৮ এইচআইভি পজিটিভ রোগী নিয়ে এআরটি কর্ণার এর যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ৭৪১ জন আইডিভুক্ত এইচআইভি পজিটিভ রোগী আছে। এর মধ্যে ৪২৩ জন রোগী নিয়মিত এআরভি গ্রহণ করছে। অনিয়মিত আছে ৩৩ জন। স্থানান্তর হয়েছে ১৬৩ জন, মারা গেছে ৯৬ জন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এআরটি সেন্টার থেকে জানানো হয়, এই হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘‘প্রিভেনশন মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন (পিএমসিটি)” নামে একটি প্রোগ্রাম চালু আছে। এই প্রোগ্রামে এইচআইভি/এইডস পজিটিভ নারীর গর্ভের সন্তান যেন এইচআইভি নেগেটিভ হয়, সে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ সেন্টার থেকে সব পর্যায়ে মানুষের জন্য বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সব ধরনের পরীক্ষা এবং ১৫-১৬ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও একাধিক কারণে এইচআইভি পজিটিভ হতে পারে। এইডসের জন্য দায়ী ‘‘হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস’’ (এইচআইভি) নামের রেট্রোভাইরাস। মানুষের রক্ত ও অন্যান্য দেহরসেই একমাত্র বেঁচে থাকে ভাইরাসটি। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি সর্দি-কাশিকেও আটকাতে পারে না শরীর।
ঢাকা আহসানিয়া মিশনের খুলনা ড্রপ ইন সেন্টারেট ম্যানেজার মো. কবির হোসাইন বলেন, “এমএসএম এন্ড হিজড়া প্রকল্পের আওতায় ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত খুলনায় ২ জন হিজড়াসহ ৪০ জন পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে গত বছর। এ বছর তাদের ডিআইসি থেকে ৯ জন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কোনো হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার নেই।”
এ বিষয়ে খুলনার নাগরিক নেতা এ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “প্রতিবছর এইডস দিবসের প্রতিবেদনে আতঙ্ক ও উদ্বেগের বাইরে হতাশা দানা বাঁধে বেশি। কারণ কোনো চেষ্টাই কাজে আসছে না। যদিও এ রোগের ক্ষেত্রে কোনো চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। তারপরও সচেতনতা বাড়ছে না। এখন প্রয়োজন চিকিৎসার সকল স্তরেই পরীক্ষার সঙ্গে এইচআইভি/এইডস পরীক্ষা কমন করে দেওয়া। তাহলে পরীক্ষার সময়ই এ নিয়ে সচেতন করার একটি উদ্যোগ সফল হতে পারে। আবার সকলেই এ পরীক্ষার আওতায় আসতে পারে। এটাই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।”
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (সিএস) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা উষা বলেন, “এইডস থেকে বাঁচতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে। যৌনরোগ বা প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। অনিরাপদ যৌনতায় কনডম ব্যবহার খুবই জরুরি। একবার ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা নিডল পুনরায় ব্যবহার না করা, শরীরে রক্ত বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণের প্রয়োজন হলে, কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস করার পূর্বে রুটিনলি এইচআইভি টেস্ট করা, এইচআইভি আক্রান্ত মাকে থেরাপির আওতায় আনতে হবে। বিপুল জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।”