যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া গ্রামের ধনপোতা ঢিবিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) প্রধান অতিথি হিসেবে খনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিশাত তামান্না।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এর আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার জনগণ অংশগ্রহণ করেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন বলেন, “গত অর্থবছরের প্রথম খননের পর আশার সঞ্চার থেকেই এবারও খনন করা হচ্ছে। পাশাপাশি শালতায় আরও একটি স্থাপনায় নতুনভাবে খনন হবে।”
এই দুই স্থানে খননের জন্য এ বছর ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন খনন সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। সে কারণে এ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। আগামীতে বরাদ্দ আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ প্রত্ন ঢিবিটি ২০০৭ সালে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে প্রথম প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় এই প্রত্ন ঢিবিতে খনন কার্যক্রম শুরু হয়। বিগত অর্থবছরে ১১টি বর্গে হ্যারিস ম্যাট্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রাচীন স্থাপনার ধবংসাবশেষ উন্মোচনসহ খননে প্রাপ্ত প্রত্ন বস্তুসমূহ নথিভুক্ত করা হয়।
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রত্ন ঢিবির সীমিত একটি অংশে খনন পরিচালনা করে প্রাচীন ইট নির্মিত চতুষ্কোণ প্রার্থনা কক্ষ সমেত একটি বর্গাকার স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায়। উন্মোচিত স্থাপনাটিকে প্রাথমিকভাবে আদি মধ্যযুগের কোনো স্থাপত্য নিদর্শনের বলে ধারণা করা হয়। কোনো প্রামাণ্য ঐতিহাসিক উপাদান শিলালিপি, মুদ্রা বা স্মারক নিদর্শন পাওয়া না যাওয়ায় স্থাপত্য কাঠামোর ব্যবহারিক উদ্দেশ্য, প্রকৃতি এমন ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে এটি পরিচিত ধনপোতা ঢিবি/বিরাট রাজার ঢিবি/ধনপতি সওদাগরের বাড়ি নামেও পরিচিত। প্রাচীন এই ঢিবিকে কেন্দ্র করে শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে নানা জনশ্রুতি।
নব্বই দশকের পূর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সংশয় ছিল। প্রথাগত ঐতিহাসিকদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল ভূমি গঠন নবীন হওয়ায় এই অঞ্চলে আদি ঐতিহাসিক যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও নিদর্শন প্রাপ্তির ঘটনা প্রথাগত ঐতিহাসিকদের প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রত্ন সূত্রের ভিত্তিতে যশোরের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে আমাদের প্রথম ধারণা প্রদান করেন বরেণ্য প্রত্নতত্ত্ববিদ কে এন দীক্ষিত।
বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বরেণ্য এই প্রত্নতত্ত্ববিদ ভরত ভায়না/জটার দেউল বা ভরত রাজার দেউল পরীক্ষামূলক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করে ঢিবির নিচে বিলুপ্ত প্রাচীন স্থাপনার অস্তিত্বের কথা প্রথম জানান।কে এন দীক্ষিতের এই প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার যশোরের প্রাচীনত্ব ঐতিহাসিকদের দীর্ঘ দিনের প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা পরিবর্তনে সাহায্য করে।
এরপর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার দমদম পীরস্থান ঢিবি, কেশবপুর উপজেলার গৌড়িঘোনা ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে ডালিঝাড়া প্রত্ন স্থানে খননের ফলে বাংলাদেশের আদি ঐতিহাসিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।
এসব প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবিতে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যক্রম পরিচালনার ফলে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর প্রত্নসাক্ষ্যসহ বিভিন্ন ধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।