গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রেম, অতঃপর বিয়ে!

জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দ্রোহের আগুনে যখন উত্তাল সারাদেশ, ঠিক তখনই বরগুনার রাজপথ মিছিল-স্লোগানে উজ্জীবিত করে রেখেছিল একদল তরুণ। সেই রাজপথের অগ্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল বরগুনার ছেলে মীর রিজন মাহমুদ নিলয় ও তাসনিম আনিকা। দ্রোহের আগুনে সেদিন হাতে হাত রেখে দুজনেই রুখে দাড়িয়েছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। সেই যে হাত ধরেছিল, এরপর আর কেউই কারও হাত ছাড়েননি।

অবশেষে কবির কবিতায় ছন্দ মিলিয়ে “মিছিলেও প্রেম হোক, ভেঙে যাক মোহ, তুমি সাজো ব্যারিকেড, আমি বিদ্রোহ” দুজনেই জীবনের ছন্দ বানিয়ে নিলেন। সেই আন্দোলনের পরিচয় থেকে প্রেম এবং অবশেষে শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) বিয়ের পিঁড়িতে বসে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করলেন এই তরুণ যুগল।

বরগুনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম সারিতে অংশ নেওয়া নিলয় (২২) পৌর শহরের আমতলাপাড় এলাকার ছেলে। তিনি ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ অধ্যয়নরত। আনিকা (২০) বরগুনা শহরের কলেজ রোড এলাকায় বসবাস করেন। তিনি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের রসায়ন বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। আন্দোলনের মিছিলেই শুরু হয় তাদের সম্পর্কের পথচলা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রেমে। পরে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে করেছেন তারা।

মীর রিজন মাহমুদ নিলয় ও তাসনিম আনিকা/ঢাকা ট্রিবিউন

ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে মনের মানুষকে বিয়ে করতে পেরে ফৌজিয়া তাসনিম আনিকা বলেন, “প্রথম কথা হচ্ছে সব কিছুই সৃষ্টিকর্তার থেকে আসে। বাসা থেকে আন্দোলনে যাওয়ার অনুমতি না থাকায় সেখানে আমার যাওয়ারই কথা ছিল না। আমি পালিয়ে গিয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। তার সঙ্গে পরিচয় আন্দোলনে। আমি মেয়েদের মধ্যে থেকে স্লোগান দিতাম, সেজন্যে সে আমাকে ৪ আগস্ট নক দেয় যে ওইদিন প্রোগ্রামে কী করা হবে। আমি জানাই যে আমরা প্রস্তুত, তোমরা মিছিল নামাও। এরপর নিলয়ের বাসায় হামলা হয়। নিলয়ের প্রতি দুর্বলতা হচ্ছে তার সাহসিকতা এবং সততা। তবুও সে আন্দোলনে প্রথম সারিতে ভূমিকা পালন করে গেছে। এ থেকেই তাকে আমার ভালো লাগতো। এরপর ৫ আগস্ট মিছিলে অনেক মানুষের ভিড়ে আমি পড়ে যাচ্ছিলাম, তখন সে আমার হাত ধরে। সেই থেকেই আমরা একসঙ্গে আছি।”

দেশ গঠনে ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, “দেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবো। আগে আমরা আলাদা আলাদা আন্দোলন করেছি। আমরা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলন করে যাব। সেখানে যদি বর্তমান সরকার বা পরবর্তী সরকার কোনো অন্যায় করে, তাহলে সে অন্যায় আমরা প্রশ্রয় দেব না। আমরা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য সবসময় কাজ করবো।”

আন্দোলন থেকে ভালোলাগা, প্রেম ও বিয়ের বিষয়ে মীর রিজন মাহমুদ নিলয় বলেন, “আন্দোলনে অনেককেই দেখেছি, ও অন্যরকম ছিল। স্লোগান দিত, কবিতা আবৃত্তি করতো। আন্দোলন চলাকালীন একদিন আমার সামনে এলো এবং মাইকটা চাইলো। বললো আমি এখন কবিতা পাঠ করবো। আমি ওইদিন ওকে চিনলাম। এরপর আন্দোলনের সময় আমাদের সবারই একটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক গ্রুপে কথা হতো। সেখানে ও সবাইকে সাহস জোগাতো। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট বিজয় মিছিলের পরে আমি সিদ্ধান্ত নিই, ওকে জানাই এবং বিয়ে করার কথা বলি। এরপর আমরা পরিবারকে জানাই, তারাও রাজি হয়ে যায়।”

দেশের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “দেশের প্রতিটি ভালো কাজে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো। দেশের কাছে আমার চাওয়া, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন সবার জানা, তেমনি এই ২৪’র গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও যেন মানুষ মনে রাখে।”

আন্দোলনে গিয়ে পরিচয়, প্রেম বিয়ের বিষয়টি বরগুনার সর্বস্তরের মানুষ দেখছেন ইতিবাচকভাবে।