বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের কথা বললেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কাটেনি। রাজনৈতিক পট পরির্বতনের পর গত কয়েকমাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে বিচারহীনতার দীর্ঘ সংস্কৃতির ইতি টানার আহ্বান সাংবাদিকদের।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করা নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে সাংবাদিকরা হামলাকারীদের “সহজ টার্গেট” হিসেবে বিবেচিত। তবে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত বছরের ৮ আগস্ট বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। নতুন সরকারের তরফ থেকে একাধিকার বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে সাংবাদিকরা সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছেন। এমনকি বিগত সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর যে হামলা নির্যাতন হয়েছিল, সেগুলোর বিচারের কথাও বলা হয়েছিল।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকারেরর পক্ষে থেকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হলেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা থামছে না। গত বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গনে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। তিন দশক আগে পাবনার ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা এই হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়েছেন এটিএন নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার জাবেদ আখতার।
আহত এই সাংবাদিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমার ওপর হামলার মূল কারণ ঈশ্বরদীর একজন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে না চেনা। তাকে আমি কেন চিনি না, এই কারণে তারা ২০-২৫ জন আমাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।”
জাবেদ আখতার বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ওই ঘটনার পর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে বহিস্কার করেছে বিএনপি এবং দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন আখতার।
তিনি বলেন, “এই ঘটনায় আমি কোনো মামলা করিনি। তারেক রহমান আমাকে ফোন করেছেন এই কারণে মামলা করিনি; বিষয়টা তেমন নয়। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের বিচারের সংস্কৃতি নেই। উল্টো আমাকেই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হবে।”
এর আগে গত সোমবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের এক সংবাদ প্রকাশের জেরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে হামলার শিকার হয় দৈনিক সমকাল পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি সোহাগ খান সুজন। হামলাকারীরা হাতুড়ি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সুজনকে গুরুতর আহত করেন। এ সময় তাকে বাঁচাতে গেলে নিউজ টুয়েন্টি ফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দেশ টিভির সাইফুল ইসলাম আকাশ ও সময়ের কন্ঠস্বর প্রতিনিধি নয়ন দাসের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে সুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সোহাগ খান সুজন।
আহত সোহাগ খান সুজন ডয়চে ভেলেকে বলেন, “যে রিপোর্টের কারণে এই হামলা, সেই রিপোর্ট কিন্তু আমার পত্রিকা সমকালে ছাপা হয়নি। তারপরও তারা আমাকে টার্গেট করে হামলা করেছে।”
ওই ঘটনায় স্থানীয় ক্লিনিক ব্যবসায়ীসহ ৭ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৮ থেকে ১০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে পালং মডেল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন তিনি।
সুজন বলেন, “দুঃখজনক বিষয় হলো, এই ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। মামলার পর থেকে অভিযুক্তরা কৌশলে হুমকি ধামকি দিয়ে চলছেন ও বিভিন্ন জায়গায় অপপ্রচার চালাচ্ছেন।”
এ ব্যাপারে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলাল উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা যথেষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আসামিরা গা ঢাকা দেওয়ায় তাদের ধরতে একটু সময় লাগছে।”
এদিকে, ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পেশাগত কাজে যাওয়ার পথে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গণশ্যামপুর এলাকায় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম, মো. আলাউদ্দিন, আব্দুল মালেক নিরব ও ফয়সাল মাহমুদের ওপর মুখোশধারীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে তাদের গুলি করলে তা লক্ষ্যচ্যুত হয়। ফলে তারা প্রাণে রক্ষা পান। পেশাগত কাজ করার সময় সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদে সেখানে মানববন্ধন হয়েছে।
ঢাকার পূর্বাচলে বানিজ্য মেলার শেষ দিনে ৩১ জানুয়ারি যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন জয়ের ওপর হামলা হয়। এই ঘটনায় তিনি ৫ জনের নামসহ অজ্ঞাত ২০/২৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। এই হামলার ঘটনায় পুলিশ চারজনকে আটক করলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়
ভোলার লালমোহনে গত ৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার লালমোহন উপজেলা প্রতিনিধি নাইমুল ইসলাম সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে গুরুত্বর আহত হয়েছেন। তাকে লালমোহন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ভোলা শহরে তাবলীগ জামায়াতের জোবায়ের সমর্থিত ওলামা মাসায়েখ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাদ বিরোধী সমাবেশ চলাকালে ২৫ ডিসেম্বর স্বেচ্ছাসেবীদের হামলার শিকার হয়েছেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভোলা জেলা প্রতিনিধি ইউনুছ শরীফ।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদারীপুরে ৩ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে মাদারীপুরে শহরের কুলপদ্দি এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। আহত সাংবাদিকরা হলেন- বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি বেলাল রিজভী, বাংলাদেশ টুডের জেলা প্রতিনিধি এমদাদ খান এবং দৈনিক দেশকালের সাংবাদিক শাহাদাত হোসেন জুয়েল।
এই ঘটনাগুলো ছাড়াও সম্প্রতি আরও কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী ছাত্রজনতার গণআন্দোলনের সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক হতাহত হয়েছেন।
“সরকারের আশ্বাসেও হামলা বন্ধ হচ্ছে না”
সাংবাদিকদের ওপর হামলা প্রসঙ্গে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক নারী বিষয়ক সম্পাদক ও আমার দেশ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মাহমুদা ডলি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের বারবার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এগুলো বন্ধ হচ্ছে না। যদিও এখন সাংবাদিকরা কিন্তু স্বাধীনভাবে লিখতে পারছেন। নিউজ বন্ধ করতে বিশেষ জায়গা থেকে কোনো ফোন আসে না।”
তিনি বলেন, “সম্প্রতি আমরা তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন শুধু এই সময়ে নয়, বিগত সময়েও সাংবাদিকদের ওপর যে হামলা হয়েছে তিনি তার বিচারের ব্যবস্থা করবেন। এজন্য একটু সময় লাগবে। তিনি আমাদের সহযোগিতাও চেয়েছেন। আইন উপদেষ্টা বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে হত্যা মামলা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সাংবাদিকদের নাম বাদ দেওয়া হবে। এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক খবর।”
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, “পুলিশ বা প্রশাসন যদি ঠিকভাবে কাজ না করে সেটা কিন্তু সংবাদ মাধ্যমেই তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক দল, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনসহ সবাই নিজেদের মতো করে দেশ চালাতে চায়। এই পরিস্থিতির মধ্যে সাংবাদিকরাই দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন। তখন তারা টার্গেটে পরিণত হন। গণতন্ত্র সঠিকভাবে চললে সাংবাদিকতাও স্বাধীন থাকতে হয়। আমরা আশা করতে চাই গত ১৫ বছরে মিডিয়ার ওপর যেভাবে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে সেখান থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার সাংবাদিকতাকে স্বাধীন ও মুক্তভাবে চলার সুযোগ দেবেন।”
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক নারী বিষয়ক সম্পাদক ও দেশ রুপান্তর পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার তাপসী রাবেয়া আঁখি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই সাংবাদিকরা বারবার আক্রান্ত হচ্ছেন। আমরা দেখছি, এখনও সাংবাদিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন। আশা করব, বর্তমান সরকার সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে।”
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমীন। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, “এখন সাংবাদিকদের ওপর যে হামলার ঘটনা ঘটছে, সেটা কোনোভাবেই কাম্য না। সরকারের উচিত হবে দ্রুত এসব হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। বিগত সরকারের আমলে যেটা হয়েছে, সেটা তো এই সরকারের সময় চলতে পারে না।”
সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান “কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)” তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, “বাংলাদেশে ৪ জন সাংবাদিক আটক হয়েছেন। এই চার সাংবাদিককেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থক হিসেবে দেখা হয়েছে।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে এসব আটকের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে লেখা হয়েছে, “যেসব সাংবাদিকের প্রতিবেদনকে হাসিনাপন্থি হিসেবে দেখা হয়েছে, তাদের অনেকেই পরে অপরাধমূলক তদন্তের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। কারাবন্দি সাংবাদিকদের সংখ্যার ভিত্তিতে সিপিজের করা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ১৪তম স্থানে রয়েছে।”
দীর্ঘদিনের সমস্যা, সমাধান কোথায়?
গত বছরের মে মাসে “রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)”-এর “প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে” দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের অবস্থা আফগানিস্তানের চেয়েও খারাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই সূচকে বিশ্বের গণমাধ্যমের অবস্থা যে ২০টি দেশে সবচেয়ে খারাপ তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান।
আরএসএফের বিবেচনায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল আজারবাইজান, নিকারাগুয়া ও রাশিয়া। ২০০৯ সালে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২১তম। সেই বিবেচনায় ১৫ বছর পর ২০২৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৪৪ ধাপ অবনতি হয়ে হয়েছে ১৬৫তম। একমাত্র ২০১৬ সাল ছাড়া প্রতি বছরই বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর হিসেবে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ৩৬৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। হত্যার শিকার হয়েছেন দুইজন। এছাড়া ৫৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১ জন।
আর আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০২৩ সালে ২৯০ সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা সব সরকারের সময়ই সহজ টার্গেটে পরিণত হই। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব হামলার বিচার দাবি করেছি। আমরা চাই, আজ থেকে আর একজন সাংবাদিকও হামলা বা মামলার শিকার হবে না সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের ঘোষণা দেওয়া হোক।”