কারা এই ‘তৌহিদি জনতা’, কে তাদের থামাবে?

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের হুমকির মুখে নাটক, বাউল উৎসব, লালন ভক্তদের মিলনমেলা বন্ধের মতো ঘটনা ঘটেছে। বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের আয়োজনও বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব হামলা ও হুমকি “তৌহিদি জনতা” নামে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই “তৌহিদি জনতা” নামে আনুষ্ঠানিক কোনো প্ল্যাটফর্ম না থাকায় কারা এর সঙ্গে জড়িত; কিংবা কার ইন্ধনদাতা, সেটি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

এসব ঘটনা বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে বার বার কড়া অবস্থানের কথা জাননো হলেও যারা হুমকি দিয়ে এসব অনুষ্ঠান বন্ধ করছেন, তারা থামছেন না।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার এক ফেসবুক পোস্টে “তৌহিদি জনতার” নামে যারা হামলা করেছেন তাদের সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেছেন, “এ কঠোরতার হুঁশিয়ারি অপরাধীদের জন্য, যারা তৌহিদের কথা বলে নিপীড়ন করছে, নৈরাজ্য করছে। কিন্তু আগে যেভাবে ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সাধারণ মুসলিমদের নিপীড়ন করা হতো, যার শিকার আমিও হয়েছি, তা কোনো মতেই আর পুনরাবৃত্ত হবে না।”

রাজধানীর মহিলা সমিতি মঞ্চে ১৫ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগর নাট্য উৎসব হওয়ার কথা ছিল। ৮৫ নাটকের দল এই উৎসবে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হুমকির কারণে মহিলা সমিতি তাদের বুকিং বাতিল করায় উৎসব স্থগিত করা হয়েছে।

যদিও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছেন, বাইরের কোনো পক্ষের হুমকি নয়; নাটকর্মীদের একটি পক্ষের বিরোধীতার মুখেরই উৎসব স্থগিত হয়েছে।

উৎসবের মহাসচিব কামাল আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমাদের মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি জানানো হয়, তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে যে উৎসবে ফ্যাসিবাদের লোক আছে, তারা এখান থেকে কোনো আন্দোলন শুরু করতে পারে, তাই উৎসব হলে হামলা করা হবে। পরে আমরা রমনা থানায় গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। তখন আমাদের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় 'নাটকটি বাদ দিয়ে উৎসব করতে বলা হয়। আমরা পরে আলোচনা করে জানাবো বলে থানা থেকে চলে আসি। আমাদের আসার সময় মহিলা সমিতির কর্মকর্তাকে থানার মধ্যেই কয়েকজন ব্যাপক হুমকি দেয়। পরে মহিলা সমিতি আমাদের বুকিং বাতিল করে দেয়।”

এদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, নাট্যকর্মীদের মধ্যেই একটা অংশই উৎসব বন্ধের জন্য আহ্বান জানায়।

তিনি উল্লেখ বলেন, “আমাদের দ্রুত অনুসন্ধান থেকে জানা গেল, নাট্যকর্মীদের মধ্যেই একটা অংশ এই উৎসবের বিরোধিতা করে মহিলা সমিতি কর্তৃপক্ষের কাছে হল বরাদ্দ বাতিলের জন্য জোর দাবি জানিয়ে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। বিক্ষুব্ধ নাট্যকর্মীদের দাবি, এই উৎসবের আড়ালে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতা হত্যায় বিবৃতি দিয়ে উসকানি দেওয়া কিছু ব্যক্তি বা তাদের গোত্রীয় কিছু মানুষ সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা দাবি জানায়, জুলাইয়ে তাদের ভূমিকার জন্য বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোনো পুনর্বাসন চলবে না। অবশেষে, মহিলা সমিতি বরাদ্দ বাতিল করে।”

উপদেষ্টার এই বক্তব্যের জবাবে জবাবে কামাল আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, “ফারুকী সাহেব হয়তো যে তথ্য জানতে পেরেছেন, তা বলেছেন। আমাদের কথা হলো, কোনো পক্ষের দাবির মুখে উৎসব বন্ধ করা হবে কেন?”

মহানগর নাট্য উৎসব স্থগিত হওয়া সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এক বিবৃতিতে বলেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর নাট্য উৎসব বন্ধ করা বা স্থগিত করা সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি। যেকোনো ধরনের সৃজনশীল ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে আমরা সবসময় উৎসাহিত করে থাকি৷ কী কারণে আলোচ্য নাট্য উৎসব স্থগিত হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। উক্ত নাট্য উৎসব ঘিরে যেকোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ডিএমপি তৎপর রয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ঢাকা শিল্পকলায়ও হুমকি ও অবস্থান নিয়ে নাটক বন্ধ করার মতো ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে, ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার উত্তরায় বসন্ত উৎসব বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ঢাকার বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ চারুকলার বকুল তলা, পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এবং উত্তরায় উন্মুক্ত মঞ্চে বসন্ত বরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। তবে উত্তরার উন্মুক্ত মঞ্চে বসন্ত বরণের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফরহাদ ইমন নামে একজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা পরিচয় দিয়ে ওই উৎসব বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফরহাদ ইমন সেই সময় বলেছিলেন, “মঞ্চটির আমরা মীর মুগ্ধ নাম দিয়েছি। কিন্তু আয়োজকেরা সেটা ব্যানারে লেখেননি। আয়োজকদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের দোসররা রয়েছেন।”

একইদিনে টাঙ্গাইলের ভুঞাপুরে বসন্ত ও ভালবাসা দিবসে ফুল বিক্রি করায় ফুলের দেকানে হামলা হয়। তৌহিদি জনতার ব্যানারে ওই হামলা হয়। আর ওই ভয়ে পরের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি সেখানে পূর্ব নির্ধারিত ঘুড়ি উৎসব বাতিল করা হয়। ঘুড়ি উৎসববিরোধী একটি লিফলেট ছড়িযে দেয়ার পর ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

তার আগে ১২ ফেব্রয়ারি টাঙ্গাইলে লালন স্মরণোৎসব বন্ধ করা হয় হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে। এর আগে হামলার কারণে নারায়ণগঞ্জে লালন ভক্তদের মিলনমেলা পণ্ড হয়।

এছাড়া জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হুমকির মুখে রংপুরে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে ১৪৪ ধারা জারির ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে, গত ১৮ জানুয়ারি পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৪ আগস্টের পর থেকে ৪০টি মাজারের ৪৪ বার হামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এখানে ১৭টি মাজারে ভাঙচুর, লুটপাট হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১০টি ও ময়মনসিংহ বিভাগে সাতটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় মোট ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্ব সূফী সংস্থা ২৩ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮০টি মাজারে হামলা হয়েছে।

সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্য আফতাব আলম জিলানী ডয়চে ভেলেকে বলেন, “ওই সংবাদ সম্মেলনের পরও আরো চার-পঁচটি মাজারে হামলা হয়েছে। তৌহিদি জনতা ও ইমাম সমিতির নামে এগুলো করা হয়। আসলে এর পেছনে ওহাবিরা আছে। আমরা প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের হুশিয়ারির পরও প্রতিকার পাচ্ছি না।”

তিনি আরও বলেন, ‘‘শুধু মাজার নয় লালনের ২৪-২৫টি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নাটক বন্ধ করা হচ্ছে৷ বসন্ত উৎসব বন্ধ করা হয়েছে। তারা আসলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সূফিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।”

নারায়ণগঞ্জের লালন ভক্ত মিলন মেলার প্রতিষ্ঠাতা ফকির শাহজালাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা প্রতিবছর লালন ভক্ত ও সাধুসঙ্গরা এক হতাম। ২৩ নভেম্বর হামলা করে পণ্ড করে দেয়া হয়৷ এখন আমি চাপের মুখে আছি। ড. আসিফ নজরুল ও ফারুকী স্যার দেখবেন বলেছিলেন। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না৷ সারাদেশেই লালনের অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হচ্ছে না।”

সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে সমর্থনদানকারী আশরাফ কায়সার ডয়চে ভেলেকে বলেন, “সরকার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান পরিস্কার করলেও তৌহিদি জনতা বা কোনো কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী তাদের হুমকি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী এটাকে প্রশ্রয় দেয়ার কারণেই ছড়িয়ে পড়ছে। এটা মব কালচার।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার শুধু বিবৃতি দিলে চলবে না। এই ধরনের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের প্রকাশ্যে আনতে হবে।”

মানবাধিকার কর্মী নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আসলে এখন হামলা-হুমকি তৌহিদি জনতা বা অন্য যে নামেই হোক না কেন তা মূলত বাংলাদেশের সংস্কৃতির ওপর আঘাত। বাংলাদেশের সাংস্কৃতির ভিত্তির ওপর পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার বার বার বিবৃতি দিলেও এখানো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সরকারের উচিত হবে শুধু বিবৃতি না দিয়ে অপরাধীদের আইনের আওয়াতায় এনে তাদের অবস্থানকে দৃশ্যমান করা।

এদিকে, এসব বিষয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

তাদের ভাষ্য, “কিছু বললেই আমাদের ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হবে, আমরা বিপদে পড়ব।”