হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নের বিচার এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অপসারণের দাবিতে গণমিছিলের কর্মসূচি দিয়েছিল বামপন্থি ৮টি ছাত্র সংগঠন। এর ‘‘পাল্টায়’’ ঢাকার পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এর কার্যালয়কে ‘‘ছাত্র-জনতার কার্যালয়” বানানোর ডাক দিয়েছেন লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য।
এমন অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা বিবেচনায় পূর্ব-ঘোষিত গণমিছিল কর্মসূচি স্থগিত করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। পরিবর্তে তারা একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন।
শনিবার (১৫ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গণমিছিলের উদ্দেশে জড়ো হন বাম নেতাকর্মীরা। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গণমিছিল স্থগিতের ঘোষণা দেন তারা।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন শুভ বলেন, “পূর্ব-ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আমরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এলেও আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা বিবেচনায় আজকের গণমিছিল কর্মসূচিটি স্থগিত ঘোষণা করছি। নিশ্চয়ই আমরা শঙ্কিত নই; নারীদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের এ লড়াই আমরা চালিয়ে যাব।”
সমাবেশে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (একাংশ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ বলেন, “আমরা খুব আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে লাখ লাখ নারী অংশ নিয়েছিল একটাই উদ্দেশ্যে। সেটা হলো, বৈষম্যহীনভাবে নারীর পথচলাকে সহজ করা এবং নারীর ওপর যত ধরনের সামাজিক বৈষম্য আছে সেগুলোকে বিলোপ করা, শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্যকে বিলোপ করা।”
তিনি বলেন, “গত ৫ আগস্টের পরে সেই নারীদেরই লাঞ্চিত হতে হচ্ছে। একটা মহল আমার ওড়না ঠিক আছে কি-না, ঠিকমতো হাঁটছি কি-না, কী খেতে পারবো, কীভাবে চলবো সবকিছুই যেন নির্ধারণ করে দিচ্ছে। নারীদের তারা মানুষ হিসেবে নয়, জড়বস্তু বা পণ্য হিসেবে দেখতে চান। আর তার বিরুদ্ধেই আজকে এখানে দাঁড়িয়েছি।”
মুক্তা বলেন, “৫ আগস্টের পরে শতাধিক মানুষকে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দেশে যেন আইন নাই, বিচার নাই, শাসনব্যবস্থা নাই। একটা সরকার যে আছে, তার নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সরকার যে আছে, গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে যে তারা ক্ষমতায় এসেছে, সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি।”
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, “আমরা এই কর্মসূচি ঘোষণা করার পর একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী আমাদের কর্মসূচি নস্যাৎ করার, আমাদের এই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য নানা চক্রান্ত করছে। আমরা এটাও লক্ষ করছি, আমাদের এই ধর্ষণবিরোধী গণ-আন্দোলনকে পুঁজি করে আওয়ামী সন্ত্রাসীরাও পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখছে। আমরা উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হুঁশিয়ারি করে বলতে চাই, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে ব্যবহার করে আপনাদের যে বাসনা; বাংলাদেশের ছাত্র, যুব সমাজ সেটি পূরণ হতে দেবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যখন ব্যর্থ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অপসারণ দাবি করছি, তখন একটা স্বার্থান্বেষী মহল নানাভাবে আমাদের ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা নাকি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের জন্য মাঠে নেমেছি। ৫ আগস্টের পর থেকে যে মব সন্ত্রাস চলছে, সেটি বন্ধ করতে হবে। এই মব ভায়োলেন্সের মধ্য দিয়ে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের হত্যাকারীদের সুষ্ঠু বিচার করতে হবে।”
সমাবেশে উত্থাপিত ৭ দফা দাবিগুলো হলো—
- আছিয়াসহ সকল হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নের বিচার করতে হবে।
- “ব্যর্থ” স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অপসারণ করতে হবে।
- জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে।
- মসজিদ, মন্দির, মাজারে হামলাকারী মব সন্ত্রাসীদের বিচার করতে হবে।
- চট্টগ্রাম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ, যৌথ বাহিনী দ্বারা শ্রমিক হত্যার বিচার করতে হবে।
- সাগর-রুনি, তনু, আফসানা, মুনিয়াসহ পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ আমলে সংগঠিত হত্যার বিচার করতে হবে।
- হিন্দু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে হামলা, লুটপাটের বিচার করতে হবে।
সমাবেশে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল), পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
এদিকে, পিনাকীর সিপিবি ভবন দখলের ডাকের পর ঢাকার পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অবস্থান দেখা গেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।