‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তনে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে প্রভাব পড়বে কি-না

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে বের হবে “শোভাযাত্রা”। প্রায় তিন যুগ ধরে এটি “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নামে চলে আসছে। তবে এ বছর শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এর নতুন নাম করা হয়েছে “বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা”। এই নামে এবার বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।

শুক্রবার (১১ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

উল্লেখ্য, চারুকলা ১৯৮৯ সাল থেকে পহেলা বৈশাখে এই শোভাযাত্রা করে আসছে। শুরুতে এর নাম ছিল ‘‘আনন্দ শোভাযাত্রা”। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে অমঙ্গলকে দূর করে মঙ্গলের আহ্বান জানিয়ে শোভাযাত্রার নামকরণ হয় ‘‘মঙ্গল শোভাযাত্রা”।

জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর এই শোভাযাত্রাকে বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে।

“মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ” – বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনটিকে ইউনেস্কোর অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতির সনদে এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে নাম বদলের ফলে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি-না, তা নিয়ে।

গতবছরের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রথমবার দেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হচ্ছে। গত কয়েকবছর ধরেই ইসলামী দলগুলো এই শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। দেশের রাজেনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ বছর সে দাবি আরও জোরালো হয়।

তবে, আয়োজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান ও চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ জানিয়েছেন, কোনো চাপের কারণে নয়; বরং পুরো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে শোভাযাত্রার প্রারম্ভিক নাম প্রত্যার্বতন করা হয়েছে।

তবে এই নাম পরিবর্তন নিয়ে সমালোচনা ও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এটির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। তবে, সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি হলো ইউনেস্কোর স্বীকৃতির বিষয়টি।

২০১৬ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর মঙ্গল শোভাযাত্রা নতুন মাত্রা পেলেও, আয়োজনটি নিয়ে বিতর্ক চলমান ছিল। ইসলামী দল ও সংগঠনগুলোর দৃষ্টিতে, এই শোভাযাত্রাটি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে এসেছে।

প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখের আগে আগে এই বিতর্কটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এবারও একাধিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সংগঠনের পক্ষ থেকে “মঙ্গল” শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়।

তবে শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম জানান, বাইরের কোনো চাপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “অতীতে 'মঙ্গল' ব্যানারটি নিয়ে বিতর্ক কম ছিল না। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় মঙ্গল শব্দটি এমনভাবে চর্চায় নিয়ে আসা হয়েছিল, যার ফলে সমাজে নেতিবাচক ধারণা জন্মে। এ কারণেই আমরা রাজনৈতিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত ও সকল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক চর্চার মূল চেতনায় ফিরে যেতে চেয়েছি।”

এদিকে, এসব বিষয় নিয়ে ১৯৮৯ সালের প্রথম শোভাযাত্রা আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ঢাবির এক সাবেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি। প্রথমবার শোভাযাত্রার আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন চারুকলার ছিয়াশি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে ছিলেন সাতাশি ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজিব তারেক।

তবে এ বছর নাম পরিবর্তনের ব্যাপারটিকে তিনি “হাস্যকর” হিসেবে মন্তব্য করেছেন।

বিবিসি বাংলাকে নাজিব তারেক বলেন, "একটি নাম যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে যার পরিচিতি ঘটেছে এখন সেই নামটা পরিবর্তনের প্রয়োজন কেন পড়লো?"

এই পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

নাজিব তারেক বিবিসি বাংলাকে আরও বলেন, "জাতিসংঘের কাছে এটা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিত। এখন মনে হতে পারে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে আর কিছু নেই, এটা হারিয়ে গেছে। এর ফলে 'ক্রেডিবিলিটি'(বিশ্বাসযোগ্যতা) হারানোর শঙ্কা রয়েছে “

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন জায়গার বাঙালিরা পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে আয়োজন করে থাকেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে নাজিব তারেক বলেন, “ইউনেস্কা স্বীকৃত একটা জিনিস, যেটা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটা তার উৎপত্তিস্থলেই পরিবর্তিত ও ভিন্ন নামে উদযাপিত হয়, এটা নেতিবাচক ধারণা দেয়।”

আওয়ামী লীগের সময়ে রাষ্ট্রের সবকিছুকে “আওয়ামীকরণ” করার অভিযোগ রয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রাকেও একই মাপকাঠিতে দেখেন অনেকে। তবে নাজিব তারেকের দাবি, বিগত বছরগুলোতে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়িসহ নানান বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে সংকুচিত হয়েছে। তাই এই শোভাযাত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুষঙ্গ হিসেবে মানতে চান না তিনি।

তার ভাষ্য, "অমঙ্গল বলতে আমরা স্বাধীনতা বিরোধী বা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বুঝিয়ে ছিলাম। তাদের বিরুদ্ধে মঙ্গলের বার্তা দেওয়াকে কোনো অবস্থায়ই খারিজ করার সুযোগ নেই।”

এদিকে, ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল সেইফগার্ডিং এর বিষয়ে একটি কনভেনশন রয়েছে ইউনেস্কোর। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ঐতিহ্যের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আলাদা কিছু দেখা যায়নি।

এই বিষয়ে জানতে চেয়ে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে ইউনেস্কোকে ই-মেইল করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তবে, সংস্থাটির ওয়েবসাইটের প্রশ্নোত্তর অংশে, স্বীকৃতির তালিকায় কোনো ঐতিহ্যকে অন্তর্ভূক্ত করার ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলা আছে।

ঝুঁকিগুলো হলো, অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর –

  • ঐতিহ্যটি থমকে যেতে পারে (বৈচিত্র হ্রাস, প্রামাণ্য সংস্করণ তৈরি ও সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের সুযোগ নষ্ট করা ইত্যাদি কারণে), অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে।
  • ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বদলে যেতে পারে, বিদেশিদের জন্য সরলীকরণ করা হতে পারে, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের কাছে এর কার্যক্রম ও অর্থ পাল্টে যেতে পারে।