গতবছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে দেখা যায়, প্রকাশ্যে দিবালোকে ১০-১২জন পুলিশ একজনকে ঘেরাও করে বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলির পর দেহ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে জানা যায়, নিহত ওই ব্যক্তি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমনগর গ্রামের কলেজছাত্র হৃদয়।
হৃদয়ের পরিবারের দাবি, গত ৫ আগষ্ট গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন তিনি।
বুধবার (১৬ জুলাই) ছিল “জুলাই শহিদ দিবস”। দিবসটি পালনে গোপালপুর উপজেলা প্রশাসন আয়োজন করে দোয়া, সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা। সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শহিদ হৃদয়ের পরিবারকে ডাকা হয়নি।
সরকার ঘোষিত এমন একটা দিবসে উপজেলা প্রশাসন শহিদ পরিবারকে আমন্ত্রণ না জানানোয় বিস্মিত হয়েছেন অনেকে। হৃদয়ের পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের এমন আচরণের নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন।
জানা গেছে, আলমনগর উত্তরপাড়ার দিন মজুর লাল মিয়ার একমাত্র ছেলে হৃদয় হেমনগর ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করতো। সংসারে অনটনের কারণে হৃদয় গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীতে বোনের বাসায় থেকে অটোরিকশা চালাতো। এ আয়ে পঙ্গু বাবা-মার খাবারদাবার ও নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতো সে। গত ৫ শেখ হাসিনার পলায়নের পর কোনাবাড়ীতে ছাত্র জনতার বিজয় মিছিলে অংশ নিলে পুলিশ তাকে আটক করে প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডের ভাইরাল হওয়া ভিডিও থেকে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা হৃদয়কে গলির ভিতর থেকে ধরে এনে কোনাবাড়ীর শরীফ মেডিকেলের সামনে মারধোর করছে। বাঁচার জন্য সে পুলিশের হাতে পায়ে ধরছে। একপর্যায়ে একজন পুলিশ সদস্য বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করছে। এরপর পুলিশের আরেকটি দল এসে তার লাশ টেনে হিঁচড়ে কোনাবাড়ী থানার ভিতরে নিয়ে যায়। তবে পরে তার লাশ আর পায়নি পরিবার।
হৃদয়ের মা রেহানা বেগম জানান, ছেলের লাশটা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন তিনি এখনও প্রতিদিনি।
হৃদয়ের ভাগ্নী জেসমিন বলেন, “জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহিদদের অনেক পরিবার সরকারি অনুদান পেয়েছে। কিন্তু লাশ গুম হওয়ায় শহিদ তালিকায় হৃদয়ের স্থান হয়নি। শহিদ তালিকায় হৃদয়কে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে সম্প্রতি গোপালপুর উপজেলা পরিষদ ঘেরাও এবং মানববন্ধন করা হয়। আজকের (বুধবার) অনুষ্ঠানে পরিবারের কাউকে আমন্ত্রণ জানানোয় প্রমানিত হয় গোপালপুর উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা লুকিয়ে রয়েছে।”
গোপালপুর উপজেলা জামায়াতের আমির হাবিবুর রহমান বলেন, “৫ আগষ্ট হৃদয় পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। আমাদের দলের নেতারা হৃদয়ের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তালিকাভূক্তকরণ এবং বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। জুলাই শহিদ দিবসের অনুষ্ঠানে এই পরিবারটিকে আমন্ত্রণ না জানানোর নিন্দা জানাই।”
গোপালপুর পৌর বিএনপির সম্পাদক চাঁন মিয়া বলেন, “হৃদয় ৫ আগষ্ট শহিদ হয়েছেন এটা সবাই জানেন। উপজেলা প্রশাসন তার পরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ না জানিয়ে বৈষম্য করেছে।
এ ব্যাপারে গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তুহিন হোসেন জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কেন তারা হৃদয়ের পরিবারের জানায়নি তা তিনি জানেন না।
তিনি বলেন, “জুলাই ফাউন্ডেশনের শহিদ তালিকায় হৃদয়ের নাম যুক্ত হয়নি। তার নাম যাতে অন্তর্ভুক্ত হয় সে জন্য প্রশাসনিক চেষ্টা চলছে।”