মধুপুরে ৭৬০ কোটি টাকার আনারস বেচাকেনার সম্ভাবনা

টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে এ বছর ৭৬০ কোটি টাকার আনারস বেচাকেনার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে এবার আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকে এ বছর দাম ভালো পাচ্ছেন চাষীরা। পাইকারি ক্রেতা বেশি থাকায় বাজারে প্রচুর আনারসের আমদানি থাকলেও দাম পড়েনি। এতে খুশি আনারস চাষীরা।

গরমের কারণে এ বছর আনারসের চাহিদা বেড়েছে। দাম ভালো পাওয়ায় পাহাড়ে আনারসের আবাদও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা। আনারস চাষে কৃষকদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।

পাইকাররা বলছেন, মোকামগুলোর বাজার তুলনামূলকভাবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। ফলের মোকামে চাহিদা বেড়েছে। গরম বেশি থাকার কারণে চাহিদা বেশি।

জানা যায়, মধুপুর গড়ের জলছত্র হচ্ছে আনারসের সবচেয়ে বড় বাজার। এছাড়াও মোটের বাজার ও গারো বাজারও আনারস বেচাকেনার জন্য বড় বাজার রয়েছে। এসব বাজারে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসেন আনারস কিনতে। এবছর ভরা মৌসুমে পাইকার অনেক। আশপাশের ময়মনসিংহ জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, বরিশাল, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা আসেন। প্রতিদিন জমজমাট বাজারে প্রচুর পরিমাণে বেচাকেনা হয়ে থাকে।

জলছত্র বাজারের আনারস চাষী শাহীন বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে বাজার ভালো যাচ্ছে। যে আনারস কয়েকদিন আগে ৪০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটা ২-৩ টাকা বেশি দামে টাকা বিক্রি হচ্ছে।”

আরেক চাষী সুরুজ আলী বলেন, “আনারসের একটি চারার দাম ৪-৫ টাকা। রোপণ খরচ এক টাকা, পাতার ঢাকা খরচ, নিড়ানী খরচ, সার, বিষ খরচ, রোদে পোড়া থেকে রক্ষার ঢাকা, পাকানো ও কর্তণ খরচ  নিয়ে ১৫-১৮ টাকা পড়ে যায়।”

ব্যবসায়ী শামসুল হক বলেন, “যেখানে ছোট ট্রাকের ভাড়া ছিল ৫-৬ হাজার টাকা। এখন ৭-৮ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। ভাড়া বাড়লেও ক্রেতাদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আনারসের দাম বেড়েছে।”

স্থানীয় ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সদস্য বেলাল বলেন, “মধুপুর থেকে প্রতিদিন শতাধিক ছোট-বড় আনারসের গাড়ি বিভিন্ন জেলায় যায়। বাজার ছাড়াও বাগান থেকেও সরাসরি ট্রাকে ওঠানো হয়। সড়ক পাকা থাকায় গ্রামের ভেতরে বাগানেও যায় গাড়ি। বাগান থেকেও মোকামে যাচ্ছে আনারস।”

জলছত্র ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, “এ বাজার থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আনারসের সমাগম ঘটে থাকে। চালক, ব্যাপারিসহ বাজারে আসা মানুষদের জন্য তাদের অফিসেই কম খরচে থাকার সুব্যবস্থা করা হয়েছে।”

স্থানীয়রা বলেন, এ গড়ের সবচেয়ে আনারসের বড় বাজার এটি। দোকানপাট থেকে শুরু করে কুলি, হকার, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে বাজার। বেচাকেনায় স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল থাকে।

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, “টাঙ্গাইল আনারসের উৎপানের অন্যতম জেলা। ২০০ চাষীকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও চাষীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর আনারসের দাম ভালো পাচ্ছেন চাষীরা। কৃষকরা আনারস দ্রুত পাকানোর জন্য অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত হরমোন যাতে কৃষকরা ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।”

তিনি আরও বলেন, “এমডি-২ জাতের আনারস বিদেশ থেকে আমদানি করা। এ জাতের আনারস বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায়। আনারস যাতে রপ্তানি করা যায় সে চেষ্টা করা হচ্ছে।”

লক্ষমাত্রা

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি মৌসুমে ৭ হাজার ৭শ ৯৪ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার টন। এর মধ্যে মধুপুরে ৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩শ ৯২ হেক্টরে জলডুগি এবং ৪ হাজার ২শ ২০ হেক্টরে ক্যালেন্ডার প্রজাতির আনারস আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত জাত এমডি-২ ১৮ হেক্টর  আবাদ হয়েছে। হেক্টর প্রতি ফলন ধরা হয়েছে ক্যালেন্ডার ৩৮ টন, জলডুগি ২৭ টন ও এমডিটু ৩৫ টন।

ইতিহাস

মধুপুর উপজেলার আউশনারা ইউনিয়নের ভেরেনা সাংমা ষাটের দশকে শেষদিকে ভারতের মেঘালয় থেকে কয়েকটি জায়ান্টকিউ জাতের আনারসের চারা নিয়ে মধুপুর গড়ে নিয়ে এসে রোপণ করেন। প্রথমবারেই ভালো ফলন হয়। খেতেও সুস্বাদু ছিল। পরে আরও বেশি জমিতে আনারস আবাদ করেন। তার দেখাদেখি অন্যরাও আনারসের আবাদ করতে থাকেন। টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের মাটি আনারস চাষে উপযোগী হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে আনারসের চাষাবাদ। ফলন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। মধুপুরের পাশাপাশি ঘাটাইলের পাহাড়ি এলাকায় আনারসের প্রচুর চাষ হয়েছে।

জিআই স্বীকৃতি

সম্প্রতি লাল মাটির আনারস জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ফলে খুশি চাষী ও ব্যবসায়ীরাও। এ আনারস এখন মধুপুরের অর্থনীতির প্রধান উৎস হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার আনারস বেচাকেনা হয়ে থাকে। প্রায় ছয় মাস ধরে কম বেশি চলে বেচাকেনা।