জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট।
সব আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আজ আবারও সবার নজর কেড়েছে অর্থমন্ত্রীর হাতের সেই চিরচেনা ‘বাজেট ব্রিফকেস’। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের অর্থমন্ত্রীরাই বাজেট পেশের দিন একটি ব্রিফকেস বা সুটকেস হাতে নিয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন। এই রহস্যময় ব্রিফকেসে আসলে কী থাকে এবং এর ইতিহাসই বা কী, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
অনেকেই কৌতুক করে ভাবেন, অর্থমন্ত্রীর ব্রিফকেসে হয়তো কোটি কোটি টাকা থাকে। তবে বাস্তবতা হলো, এই ব্রিফকেসে কোনো টাকা থাকে না। এর ভেতরে থাকে বাজেট বক্তৃতার চূড়ান্ত ড্রাফট বা অনুলিপি এবং বাজেট সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও সরকারি নথিপত্র, যেখানে দেশের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও করের হিসাবলিপি থাকে। প্রথা অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রী এই ব্রিফকেস হাতে নিয়ে সংসদে প্রবেশের আগে চিত্রসাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ছবি তোলেন।
বাজেট ব্রিফকেস বহনের এই বিশ্বজনীন প্রথার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও গবেষক আকবর আলি খান তাঁর ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি যখন অনেক বড় হয়ে যায়, তখন বাজেটবিষয়ক বিশাল প্রস্তাবগুলো শুধু একটি সাধারণ মানিব্যাগে সংকুলান করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে মানিব্যাগের জায়গা দখল করে নেয় এই ব্রিফকেস।
ইতিহাস অনুযায়ী, এই রীতির সূচনা অষ্টাদশ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্য থেকে। ১৮৬০ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার (বাজেট প্রধান) উইলিয়াম ই গ্ল্যাডস্টোন একটি লাল চামড়ার সুটকেসে করে বাজেট সংক্রান্ত নথি নিয়ে আসেন। সেই সুটকেসের ওপর সোনা দিয়ে রানির রাজকীয় ছাপ দেওয়া ছিল। পরবর্তীতে গ্ল্যাডস্টোনের ওই একই ব্যাগ বহু বছর ধরে ব্রিটেনের বিভিন্ন সরকারের আমলে বাজেট পেশে ব্যবহৃত হয়েছে। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির বর্ণনা অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীতে ‘একজনের বাজেট খোলার’ কথাটি মূলত কোনো গোপন বা কৌশলগত বিষয় প্রকাশ করার অর্থে ব্যবহৃত হতো।
বাজেট প্রস্তাবের দিন ব্রিফকেস ব্যবহারের অন্যতম প্রধান ব্যবহারিক কারণ হলো এর চরম ‘গোপনীয়তা’। বাজেটে কোন পণ্যের কর বাড়বে বা কোনটির কমবে, তা জনসমক্ষে আসার আগে শতভাগ গোপন রাখা অপরিহার্য। বাজেটের তথ্য আগেই ফাঁশ হয়ে গেলে অসাধু ব্যবসায়ীরা রাতারাতি তার অপব্যবহার করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলতে পারেন। তাই রাষ্ট্রীয় এই গোপন নথি সুরক্ষিত রাখতে ব্রিফকেস ব্যবহার করা হয়।
এই উপমহাদেশে বাজেট ব্রিফকেসের প্রথা চালু করেন জেমস উইলসন। তিনি ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল কলকাতায় ব্রিটিশ ভারতের প্রথম বাজেট পেশ করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ পূর্ব বাংলা প্রদেশে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে হামিদুল হক চৌধুরী যখন ১৯৪৮-৪৯ সালের বাজেট পেশ করেন, তখনও এই ‘বাজেট ব্রিফকেস’ রীতি মানা হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন যখন দেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন, তার হাতেও ছিল ঐতিহ্যবাহী বাজেট ব্রিফকেস। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার বাজেট পেশকারী দুই সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিতকেও এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে দেখা গেছে।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ঐতিহ্যের এই ব্রিফকেসের রঙ সবসময় লাল ছিল না। বছর ও অর্থমন্ত্রীদের পছন্দের পরিবর্তনে কখনো কালো, কখনো মেরুন আবার কখনো চকোলেট রঙের ব্রিফকেস হাতে অর্থমন্ত্রীদের সংসদ ভবনে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। আজ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হাত ধরে সেই শতাব্দীপ্রাচীন রেওয়াজ আরও একবার দেখল দেশের মানুষ।