ব্যাংক খাতে প্রথমবারের মতো লোকসান হয়েছে। ২০২৫ সালে এ খাতের নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালেও নিট মুনাফা ছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এর আগের বছরগুলোতে সব সময়ই ব্যাংক খাত মুনাফা করছিল।
কিছু বহুজাতিক ও বেসরকারি ব্যাংক ভালো মুনাফা করলেও কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের বড় ক্ষতির কারণে পুরো খাত লোকসানে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ২০২৫ সালের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি প্রতিবেদনের এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সালে মুনাফা কমে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর ২০২৫ সালে পুরো খাত লোকসানে চলে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (একিউআর) করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত এ মূল্যায়নে কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সামনে এসেছে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এর আগে, ২০০৪ ও ২০০৬ সালে ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির সময় পুরো খাত লোকসানে পড়েছিল। এছাড়া ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারির প্রভাবে ব্যাংক খাতের লোকসান হয়েছিল ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১০টি ব্যাংক মিলিয়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। তবে কয়েকটি লাভজনক দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের মুনাফার কারণে মোট লোকসান কমে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এরপর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩১ হাজার কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকও লোকসানে রয়েছে।
অন্যদিকে, বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে শীর্ষে রয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৫৯% বর্তমানে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ বা ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত বছর শেষে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ। বাকি অংশ খেলাপি, অবলোপন করা এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণার নিয়ম কঠোর করেছে। ২০২৫ সালের জন্য কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০% বা তার বেশি হলে ওই ব্যাংক আর লভ্যাংশ দিতে পারেনি। আবার মূলধন কিংবা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংক যত মুনাফাই করুক, লভ্যাংশ দিতে দেওয়া হয়নি। এই নিয়মে এবার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। ২০২৬ সালের জন্য এসব নির্দেশনার পাশাপাশি নতুন দুটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এবার পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে ওই ব্যাংক ২০২৬ সালের জন্য নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।