দেশের মোবাইল ফোনের বাজারে শীর্ষে অবস্থান করছে স্মার্টফোন ব্র্যান্ড শাওমি।
ব্র্যান্ডটির এক নম্বর অবস্থানে উঠে আসার কথা ও এই শিল্পের চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী। তার সঙ্গে কথা বলেছেন জিসান বিন লিয়াকত।
ঢাকা ট্রিবিউন: শাওমি বাংলাদেশে যাত্রা শুরু কবে? আপনি কীভাবে কাজ করছেন?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: আমরা ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছি। এখানে আমাদের যাত্রার চার বছরেরও বেশি সময় হয়ে গেছে। আর এই সময়েই আমরা দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় স্মার্টফোন ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছি।
২০১০ সালে শাওমি মূলত এমআইইউআই নামে একটি সফ্টওয়্যার ছিল। এরপর আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হার্ডওয়্যারে আমাদের প্রথম পণ্য হিসাবে স্মার্টফোন প্রবর্তন করি। ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীর চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে এতে বিভিন্ন বিভাগ জুড়ে সংযুক্ত ডিভাইসের একটি ইকোসিস্টেমে পরিণত করেছি। সকলের জন্য শাওমির ডিএনএ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঢাকা ট্রিবিউন: কাউন্টারপয়েন্টের মতে, ২৮.৮% মার্কেট শেয়ার নিয়ে বাংলাদেশের এক নম্বর স্মার্টফোন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে শাওমি। এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে সর্বোচ্চ গুণমান ও সঠিক মূল্য নির্ধারণ। গ্রাহক-কেন্দ্রিক ব্র্যান্ড হওয়ার কারণে আমরা সর্বদা ভোক্তাদের প্রবণতা, আচরণ ও প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর রাখি।
গত চার বছরে আমরা এমন বৈশিষ্ট্যগুলো প্রস্তাব করেছি যা ব্যবহারকারীর প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়। গুণমান ও গ্রাহকের অভিজ্ঞতার ওপর দৃষ্টি দিয়ে আমরা প্রযুক্তিকে আরও কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটি দেখেছি।
এছাড়া আমাদের স্থানীয় কারখানার উৎপাদন বাজারে এক নম্বর অবস্থান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশে একটি কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে আরও ভালো শাওমি ডিভাইস দিতে পারছি।
ঢাকা ট্রিবিউন: দেশে শাওমি'র বৃদ্ধি কোন বিষয়গুলো বেশি প্রভাব রেখেছে?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: শাওমি ‘‘গ্রাহকই প্রথম'' পদ্ধতিতে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী আমাদের বড় উত্সাহী ব্যবহারকারী রয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিকাশে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখে।
এছাড়া আমরা স্থানীয় নেতৃত্বও নিশ্চিত করে থাকি। সে হিসেবে শাওমি বাংলাদেশের সকল কর্মী এখন পর্যন্ত স্থানীয়। আমাদের চাওয়া বিশ্বব্যাপী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠা। শাওমি বাংলাদেশের একমাত্র ফরচুন-৫০০ ব্র্যান্ড, যেখানে সবাই বাংলাদেশি। আমরা বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের পর থেকে গ্রাহকদের একটি দুর্দান্ত ব্র্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্যও কাজ করে যাচ্ছি।
আমরা একটি ত্রি-মুখী ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেছি। এরমধ্যে হার্ডওয়্যার, ইন্টারনেট পরিষেবা ও খুচরা বিক্রয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশে শাওমি ব্র্যান্ডের জন্য তিন হাজারের বেশি তরুণ ও উদ্যমী মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে।
নিয়মিত আমরা বিশ্ব বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলছি। শাওমি ভক্তদের জন্য একই সময়ে দেশে নতুন ডিভাইস লঞ্চ করছি। দেশে ফাইভ-জি সম্প্রসারণ শুরু হওয়ায় তরুণদের কথা মাথায় রেখে শাওমি ১২ প্রো, শাওমি ১১টি ও শাওমি ১১আই এর মতো ডিভাইস চালু করেছি।
ঢাকা ট্রিবিউন: শাওমি কারখানায় এখন কী ধরনের স্মার্টফোন তৈরি হচ্ছে? আপনার কারখানায় কত লোক কাজ করছে?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: দেশে শাওমি স্মার্টফোনের চাহিদার প্রায় ৯৫% স্থানীয় কারখানার মাধ্যমে পূরণ করা হয়। রেডমি ১০এ, রেডমি ১০সি, ও রেডমি নোট ১১-এর মতো সব ধরনের এন্ট্রি ও মিড-রেঞ্জ ফোন এখন বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে।
এখন শাওমির কারখানায় ৪৫০ জনেরও বেশি মানুষ কর্মরত। ভবিষ্যতে ১,০০০টিরও বেশি প্রযুক্তিগত চাকরির ক্ষেত্রে তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা ট্রিবিউন: এ বছরের বাজেটে সরকার ব্যবসায়িক পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবসার জন্য ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। এতে শিল্প কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোন ব্যবসার প্রতিটি পর্যায়ে (বিপণনকারী থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত) ৫% মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ছাড়ের সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাছাড়া উল্লেখ করতে হয়, গ্রাহকদের কাছে মোবাইল ফোন ব্যবসার জন্য তিন থেকে চার স্তরের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল রয়েছে।
ফলে হ্যান্ডসেটটি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর আগে এই ধাপগুলির জন্য নতুন ভ্যাট প্রযোজ্য হয়ে যায়। এজন্য দাম অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।
এছাড়াও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ববাজারে পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে অন্যান্য বিভিন্ন পণ্যের মতো বাজারে স্মার্টফোনের দাম ইতিমধ্যে ২০% বেড়েছে।
ঢাকা ট্রিবিউন: যেহেতু ১২-১৪ টি কোম্পানি ইতিমধ্যেই দেশে মোবাইল ফোন তৈরিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তাই হ্যান্ডসেট নির্মাতারা কি ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করে নিরুৎসাহিত হবে?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার অবশ্যই নির্মাতাদের নিরুৎসাহিত করছে। আমরা জানি যেকোনো দেশের জন্য ভ্যাট ও ট্যাক্স সংগ্রহ করা একটি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজ খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হলেও তারা অবৈধ বাজার বা অবৈধ মার্কেট বন্ধের চেষ্টা করছে না। যেহেতু ধূসর পণ্যগুলি অননুমোদিত চ্যানেলের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে, এটি সনাক্তহীন থেকে যায়। এটি অর্থ পাচারকে উৎসাহিত করছে।
কর বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ মার্কেটও বন্ধ করতে হবে। কর বাড়তে পারে এটাই স্বাভাবিক, তবে কর বৃদ্ধি ও গ্রে মার্কেটের প্রসার একই সঙ্গে চলতে থাকলে তা খাতের জন্য ক্ষতিকর। প্রতিবেশী দেশ নেপাল সম্প্রতি তাদের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক থেকে সব অননুমোদিত ফোন নিষ্ক্রিয় করা শুরু করেছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোও অননুমোদিত ফোন বিক্রি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
ঢাকা ট্রিবিউন: মোবাইল ফোন উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ সচল রাখতে কী করা উচিত?
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: বিনিয়োগ মূলত মাইক্রো ও ম্যাক্রো পর্যায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে। আমরা মনে করি বেশিরভাগ ব্র্যান্ড এখন বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিচালনার উপর আরও জোর দেবে।
কিন্তু উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ সমর্থন করার জন্য সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া একটি অনুকূল স্মার্টফোন রপ্তানি নীতি প্রণয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ আমাদের বিদ্যমান রপ্তানি নীতিতে নগদ প্রণোদনা পাওয়ার জন্য স্থানীয়ভাবে তৈরি হ্যান্ডসেটের জন্য ন্যূনতম ৩০% মূল্য সংযোজন প্রয়োজন। কিন্তু যেহেতু স্মার্টফোন বাংলাদেশের একটি উদীয়মান খাত, তাই স্মার্টফোন রপ্তানির ক্ষেত্রে এই শর্ত শিথিল করা উচিত।
এছাড়া ব্র্যান্ড মালিক ও জাতীয় পরিবেশকদেরও অন্যান্য দেশের মতো স্মার্টফোন রপ্তানির সুযোগ দিতে হবে। এটি আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।