ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট শাসনের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা। আর এমন এক সময়েই বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যাংকার তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করছেন।
এমডি ও সিইও পদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবসরে গেছেন। এছাড়া কয়েকজন নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই চাকরি ছেড়ে গেছেন।
প্রশ্ন উঠছে, তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন নাকি চাপের কারণে পদ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন?
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স অব বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের (এমটিবি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আনিস এ খান বলেছেন, এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সিনিয়র যোগ্য ব্যাংকাররা যেভাবে যাচ্ছেন। এটি একটি আতঙ্কের মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে। এটি শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য ভালো নয়। হ্যাঁ, সকল ব্যাংক নয়, তবে কয়েকটি ব্যাংক কর্পোরেট গভর্নেন্সের অভাবে ভুগছে, যা সমস্যার প্রধান কারণ।
তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, এর একটি প্রধান কারণ হল ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট গভর্নেন্সের অভাব। বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার হস্তক্ষেপ। কিছু বোর্ড অব ডিরেক্টরস ম্যানেজমেন্টের উপর ক্ষমতা রাখে। তারা ঋণ অনুমোদন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এ পরিস্থিতিতে একজন যোগ্য এবং সিনিয়র ব্যাংকারের পক্ষে সহ্য করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ফলস্বরূপ, আপনি একদিকে নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) বৃদ্ধি দেখতে পাবেন আবার অন্যদিকে মূলধনের অপ্রতুলতা বৃদ্ধি পাবেন।
তড়িঘড়ি পদত্যাগ?
তথ্য বলছে, পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক চাপে সম্প্রতি দুই বিশিষ্ট ব্যাংকার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল) থেকে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন আইবিবিএলের ডিএমডি মো. সিদ্দিকুর রহমান। তার এক সপ্তাহ আগেই আরেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন। দুজনের কেউই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে, শাহ সৈয়দ আবদুল বারী নিয়োগের মাত্র সাত মাস পরে ২০২১ সালের নভেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে সরে যান।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ওইদিন ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যদের একজনের হাতে অপমানিত হয়ে পদত্যাগ করেন বারী। যদিও পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়াও বিপুলসংখ্যক ব্যাংকার তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। যেমনটি ঘটেছিল মেঘনা ব্যাংক থেকে মোহাম্মদ নুরুল আমিন, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক থেকে তরিকুল ইসলাম চৌধুরী ও মো. গোলাম ফারুকের ক্ষেত্রেও।
তারা প্রায় সবাই পদত্যাগের কারণ হিসাবে স্বাস্থ্য সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড থেকে পদত্যাগ করেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও হিসেবে তার তিন বছরের চুক্তির শেষে আর নবায়ন করেননি।
সাবেক ব্যাংকাররা যা বলছেন
পদত্যাগ করা কয়েকজন সিনিয়র ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বললে, তারা চাপের কারণে পদত্যাগের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন।
প্রাইম ব্যাংকের আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রাহেল আহমেদ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে পদত্যাগ করেন। তিনি অবশ্য পদত্যাগের পর অবসর নেননি। তিনি ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী নগদ-এর সিইও হন।
এরপরে, ২০২২ সালের আগস্টে তিনি অগ্রিম প্রতিষ্ঠা করেন। এটি একটি প্রতিষ্ঠান যারা তাৎক্ষণিক আর্থিক চাহিদা পূরণে অসংখ্য শিল্পের কর্মচারীদের অর্জিত বেতনের বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী বেতন দেবে।
প্রাইম ব্যাংকে তার সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে রাহেল আহমেদ বলেন, আমি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমি এই মুহূর্তে বিশেষ করে নগদের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, দুই বা তিনটি ব্যাংকের ভিত্তিতে পুরো ব্যাংকিং খাতকে বিচার করা ন্যায়সঙ্গত বলে আমি মনে করি না।