Thursday, July 16, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

খেলাপি ঋণ আদায় করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আসছে নতুন আইন

ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণ ও অচল জামানত পুনরুদ্ধারে নতুন আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে 

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম

দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় এবং অচল হয়ে পড়া জামানত সচল করতে বড় ধরনের আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ (ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট বা ডামা) নামে একটি নতুন আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

এই আইনের আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো বিশেষায়িত বেসরকারি ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ গড়ে তোলার পথ উন্মুক্ত হচ্ছে, যারা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে খেলাপি ঋণ কিনে নিয়ে তা আদায়ের দায়িত্ব নেবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে খসড়া আইনটি জনমত ও অংশীজনদের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতের পুঞ্জীভূত মন্দ ঋণ কাটিয়ে ওঠার একটি কার্যকর ও আধুনিক বাজারভিত্তিক সমাধান মিলবে। 

কেন এই নতুন আইন?

আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের দুর্বল কাঠামোর কারণে বছরের পর বছর ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি, অবলোপন (রাইট-অফ), পুনঃ তফসিল ও আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণসহ মোট সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০%।

এই বিশাল অঙ্কের অচল ঋণ ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) দুর্বল করার পাশাপাশি নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে, যা পুরো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এই সংকট থেকে উত্তরণেই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “সাধারণত খসড়া আইনের ওপর খুব বেশি মতামত পাওয়া যায় না, তবে ‘ডামা’ নিয়ে অংশীজনদের কাছ থেকে ভালো ও গঠনমূলক মতামত আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।”

যেভাবে কাজ করবে নতুন কাঠামো

খসড়া আইনে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য ত্রিস্তর বিশিষ্ট একটি আধুনিক আইনি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে:

সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট: বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে প্রশাসনিকভাবে পরিচালিত হলেও এটি একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হিসেবে কাজ করবে। এই ইউনিটটি বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া, তদারকি, জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা রাখবে। এছাড়া, এটি খেলাপি সম্পদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার পরিচালনা করবে এবং প্রয়োজনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে পারবে।

সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি: বেসরকারি খাতে গঠিত এই কোম্পানিগুলো লাইসেন্স নিয়ে সরাসরি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে খেলাপি ঋণ কিনে নেবে। শুধু জামানত বিক্রিই নয়, তারা ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর বা ব্যবসা ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে অচল ব্যবসা সচল করে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করবে।

ঋণ সেবাদাতা কোম্পানি: এরা মূলত ঋণগ্রহীতার সাথে আলোচনা, পুনঃতফসিল, সমঝোতা এবং আদালতের মামলায় সহায়তা করবে। তবে তারা নিজেরা মামলা করতে পারবে না, জনগণের কাছ থেকে আমানত নিতে পারবে না এবং কোনো ধরনের জোরপূর্বক বা বেআইনি পন্থায় ঋণ আদায় করতে পারবে না।

তবে শর্ত হলো, নতুন কোম্পানিগুলোর পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি, আইন বা সম্পদ পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০% সদস্যকে ‘স্বাধীন পরিচালক’ হতে হবে। তবে কোনো কোম্পানিই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা করতে পারবে না।

বিদেশি বিনিয়োগ ও বন্ডের সুযোগ

প্রস্তাবিত আইনে আন্তর্জাতিক অনুসরণে ‘সিকিউরিটাইজেশন’-এর সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, খেলাপি ঋণগুলোকে একত্র করে তার বিপরীতে বন্ড বা আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যু করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করা যাবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশের বাজারে যুক্ত হওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে।

কার্যকারিতা বাড়াতে তিন পরামর্শ

আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানের ও বাজারভিত্তিক করতে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান তিনটি বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন:

বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ: কোম্পানিগুলো যেন কম মূল্যে ঋণ কিনে তা পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরে লাভজনক মূল্যে বিক্রির একটি কার্যকর ব্যবসায়িক সুযোগ পায়।

আইনি জটিলতা দূরীকরণ: মন্দ ঋণ কেনাবেচা ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি ধোঁয়াশা দূর করা প্রয়োজন, যাতে সেকেন্ডারি মার্কেট দ্রুত গতি পায়।

নির্বিঘ্ন জামানত স্থানান্তর: ব্যাংকের কাছে থাকা জামানত ও আইনি অধিকার যেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই কোম্পানির কাছে এবং পরবর্তীতে নতুন ক্রেতার কাছে স্থানান্তর করা যায়, তার স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। 

২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বর্তমানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “অতীতেও  দেশে দুই-তিনটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ছিল। কিন্তু সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ও সুরক্ষার অভাবে তারা খেলাপিদের বাড়ির সামনে ঢোল পেটানো বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পাঠানোর মতো অপেশাদার উপায়ে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করত, যা সফল হয়নি।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন আইনের মাধ্যমে অতীতের সেই সব দুর্বলতা কেটে যাবে এবং ব্যাংক খাতের দৃশ্যপট বদলে যাবে।

   

About

Popular Links

x