বাম্পার ফলন, তবুও কেন বাড়ছে লবণের দাম

দেশে রেকর্ড পরিমাণ লবণ উৎপাদনের পরও ঈদ-উল-আজহাকে সামনে রেখে বাড়ছে লবণের দাম।

বাজারের তথ্য বলছে, গত ৭ থেকে ১০ দিনে প্রতি ৭৪ কেজি বস্তা লবণের দাম বেড়েছে প্রায় ১৫০ টাকা।

২০২২ সালের তুলনায় এটি প্রতি বস্তা ৩৫০ টাকা বেড়েছে।

বছরের এই সময়টিতে লবণের চাহিদা বেড়ে যায়। আর এই সময়েই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, লবণের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ বছর প্রতিটি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বাড়বে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এবার আমরা ঈদের পর গরু, ছাগল ও মহিষের মতো কোরবানির পশু থেকে প্রায় এক কোটি পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।”

“তবে এবার হঠাৎ করে লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমরা খুবই চিন্তিত। এর ফলে শুধু চামড়া সংরক্ষণের খরচই বাড়বে না, স্থানীয় পর্যায়েও এর প্রভাব পড়বে। এই বর্ধিত দাম তারা কিভাবে মেলাতে পারবে সেটাও চিন্তার বিষয়।”

এ ছাড়া মজুরি, লবণ পরিবহন বা উৎপাদন খরচ কোনোটাই ২০২২ সালের তুলনায় লবণের এই আমূল বৃদ্ধিকে সমর্থন করে না বলেও মনে করেন তিনি।

এ বছর লবণের দাম বেশি হওয়ায় চামড়ার প্রতিটি টুকরো সংরক্ষণ করতে কত খরচ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা প্রতি বস্তা (৭৪ কেজি) লবণের ৯-১০টি চামড়া সংরক্ষণ করতে পারি। আগের বছরের তুলনায় যদি আমাদের ৩০০-৩৫০ টাকা বেশি দিতে হয়, তাহলে লবণের দাম বৃদ্ধির কারণে কাঁচা চামড়ার দাম ৩০-৩৫ টাকা বেড়ে যাবে।”

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) মতে, সম্প্রতি সমাপ্ত মৌসুমে ২.২৩ মিলিয়ন টন লবন উৎপাদন হয়েছে। যা ২০২২ সালের ৪৮৯,০০০ টন বা বছরে ২২%-এর চেয়ে বেশি।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২২ সালে লবণের উৎপাদন ছিল ১.৮ মিলিয়ন টন ও ২০২১ সালে ১.৮ মিলিয়ন টন।

তবে লবণ উৎপাদন সর্বকালের সর্বোচ্চ হলেও দেশে লবণের দাম কমছে না। গত দেড় সপ্তাহ ধরে লবনের দাম বাড়ছে।

এ বছর মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম ছিল প্রতি মণ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু মৌসুম শেষে তা এখন ৫০০ থেকে ৫৩০ টাকায় উঠেছে। 

দেশের প্রধান পাইকারি লবণের হাট চট্টগ্রামের মাঝির হাটে লবণের দাম ছিল ১১৫০-১২১০ টাকা।

যাইহোক, মিল মালিকরা লবণের দাম বৃদ্ধির জন্য জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও উচ্চ শ্রমিক মজুরিসহ একাধিক কারণকে দায়ী করেছেন।

লবণ উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও, চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে চাহিদা পর্যাপ্তভাবে পূরণ করা যাচ্ছে না, যার ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন হচ্ছে না।

জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের তুলনায় এ বছর লবণের দাম বাড়ানোর আশঙ্কা করছেন মিল মালিকরা।

তবে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির এই ধারণার বিপরীতে বলেছেন, “উৎপাদন আরও বাড়লে দাম কমে আসবে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মূল্যস্ফীতির চাপে লবণ পরিশোধনের খরচ বেড়েছে। ফলে ২০২২ সালের তুলনায় এ বছর লবণের দাম বেড়েছে।”

সাম্প্রতিক তীব্র লোডশেডিং মিলগুলোর কার্যক্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। এসব সংকটের সমাধান না হলে লবণের দামের প্রত্যাশিত হ্রাস বাস্তবায়িত হবে না বলে মনে করেন কবির।

অ্যাসোসিয়েশন অব রাহাইড ট্রেডার্সের মতে, প্রতিটি বড় কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে ১০ থেকে ১২ কেজি লবণ, মাঝারি চামড়া সাত থেকে আট কেজি ও ছোট জন্য পাঁচ থেকে ছয় কেজি লবণ প্রয়োজন হয়।

লবণ মিল মালিকদের মতে, ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর জন্য সাধারণত ১ থেকে দেড় লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। 

এবারও কোরবানির ঈদে লবণের চাহিদা প্রায় একই।

তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থবছরে শুধু চামড়া শিল্পেই লবণের চাহিদা ৩ লাখ ৪১ হাজার টন।

সেই তুলনায় আগামী অর্থবছরে চাহিদা ৪ লাখ ৪৫ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ঈদ-উল-আযহার সময় চাহিদা আরও বেড়ে যায়, ব্যবসায়ীরা লবণের বাজারের ভবিষ্যত স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

চট্টগ্রাম র‌্যাহাইড ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা খোরশেদ আলম বলেন, প্রতিটি গরু বা মহিষ থেকে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য আনুমানিক ৮ থেকে ১০ কেজি লবণের প্রয়োজন হয়।

এই প্রক্রিয়ায় পরিবহন, শ্রমের মজুরি এবং লবণের খরচ মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ায় ২৫০-৩০০ খরচ হয়। চামড়া কেনার দাম ও এই খরচ মিলিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীরা এই বছর সম্ভাব্য লোকসানের চিন্তা করছেন।

ফলে এ মৌসুমে কোরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় সংকটের আশঙ্কা রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন।

তিনি চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণের অপরিহার্যতার উপর জোর দেন ও লবণের দাম বাড়ালে চামড়ার দামের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলেও জানান।

তবে সরকার নির্ধারিত মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। ট্যানারির মালিকরা বেশি দাম দিতে রাজি নয় বলেও উল্লেখ করেন এই ব্যবসায়ী উদ্দিন।

তার মতে, “ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ দূর করতে লবণের দাম কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”