আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের দুই কিস্তির অর্থ একসঙ্গে পাচ্ছে বাংলাদেশ। এজন্য তাদের দেওয়া কিছু শর্ত বাংলাদেশকে পূরণ করতে হচ্ছে। একটি ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া।
বুধবার (১৪ মে) সেই ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অবশ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রপ্তানি ভালো থাকলেও এখনই ডলারের দাম বাজারের ওপর ছাড়তে চাইছিল না। অর্থনীতি আরও একটু স্থিতিশীল হলে তারপর ভেবে দেখা যেত বলছেন বিশ্লেষকেরা।
কিন্তু বাজেট সহায়তার জন্য বাংলাদেশ আইএমএফ-এর দুই কিস্তির ১.৩ বিলিয়ন ডলার দরকার। এটা আইএমএফ দিলে উন্নয়ন সহযোগীরা আরও ৩.৩ বিলিয়ন ডলার দেবে আশা করা হচ্ছে।
আইএমএফ বাংলাদেশকে মোট ৪.৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার চুক্তি করেছে গত সরকারের আমলে। ইতোমধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কিস্তির ঋণ তারা দিয়েছে। এখন চতুর্থ এবং পঞ্চম কিস্তির ঋণ একসঙ্গে দিতে সম্মত হয়েছে। এটা পেতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুই ভাগে আলাদা করা হয়েছে। আর সর্বশেষ ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বুধবার দুবাই থেকে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করে দেওয়ার সময় হয়েছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। বাজারভিত্তিক করা হলেও বর্তমানে ডলারের যা দর রয়েছে, তার থেকে খুব বেশি তারতম্য ঘটবে না।
তিনি বলেন, “গত কয়েক মাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ডলার বাজার স্থিতিশীল ছিল। আগামীতেও আশা করছি ডলার বাজারে ইন্টারভেন করার দরকার হবে না।”
এদিকে, বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “সংস্কারের বিষয়ে বাংলাদেশের যে সদিচ্ছা আছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেই বার্তা দিতেই ডলারের দাম ‘বাজারভিত্তিক’ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “তবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে ডলারের দাম বেশি বেড়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করবে।”
ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সম্প্রতি ডলারের দাম ১২২ টাকার মধ্যেই ছিল। তবে কার্ব মার্কেটে ১২৪ টাকা। বুধবারের ঘোষণার পর কার্ব মার্কেটে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২ পর্যন্ত ডলারের দাম এক থেকে দেড় টাকা বেড়েছে। ব্যাংক রেট এখনো আগের মতোই আছে। দুপুর ২টার পর আবারও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দেখা যায় ডলারের বিনিময় হারে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
‘সিদ্ধান্ত সঠিক'
ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, “হোয়াট ইজ দ্য প্রাইস অব ডলার? হোয়াটএভার দি মার্কেট ইস রেডি টু পে। এই কথাই হলো ডলারের প্রকৃত দাম নির্ধারণের সূত্র। এত দিন তো আমরা দাম জোর করে ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু বাজারই ডলারের দাম নির্ধারণ করবে। সেই দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত ঠিক আছে। এবং এটা নিয়ে অনেক দিন ধরে কথাও হচ্ছিল।”
তার কথা, “এখন আমদানি কমে এসেছে, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার কমেছে, রপ্তানিও বেড়েছে, প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩০%, আন্ডার ইনভয়েস কমেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বেড়েছে। এর সঙ্গে বাজেটকে সাপোর্ট দিতে আমাদের আইএমএফ-এর ঋণ দরকার। এই সব মিলিয়ে ডলারের দাম বাজারেও ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো।”
তবে তারপরও চিন্তার জায়গা রয়ে গেছে বলে মনে করেন মামুন রশীদ। এই ডলার শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যেতে পারে সেই ভাবনা আছে। তিনি বলেন, “এজন্য আমাদের স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড লাগবে। আর রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয়ের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। ট্যারিফ স্ট্রাকচার সংস্কার করতে হবে।”
টাকা-ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এতদিন “ক্রলিং পেগ” পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছিল। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি ডলারের বিপরীতে বর্তমানে ১১৯ টাকা দামের (নির্ধারণ করে দেয়া) সঙ্গে ২.৫% পর্যন্ত দাম বাড়তে ও কমতে পারে। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ এক টাকা ব্যবধানে ডলার বিক্রি করা যায়। ফলে ডলারের দাম এখন সর্বোচ্চ ১২৩ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হওয়ার কথা। তবে এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তারও আগে বাংলাদেশ ব্যাংক মিনিময় হার নির্ধারণ করে দিতো। কিন্তু এখন বিনিময় হার হবে চাহিদা ও যোগানের ওপর।”
‘সবকিছুর দাম বাড়ার আশঙ্কা আছে’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির আশঙ্কা করেন, “এই সময়ে বাজারের ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়ায় অনেক ঝুঁকি আছে। এখন ডলারের চাহিদা বেশি ফলে ডলারের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে। আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। ফলে সবকিছুরই দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আর কাঁচামাল আমদানি খরচ বাড়লে শিল্পের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “আমাদের রিজার্ভ আইএমএফ-এর হিসাবে ২১ বিলিয়ন ডলারের মতো। আমার বিবেচনায় রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের মতো হলে তখন ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেত। এটা আসলে আইএমএফ-এর ঋণ পাওয়ার জন্য তাদের চাপে আগেই করে ফেলা হলো। সাত দিন আগেও বলা হয়েছে পরিস্থিতি ভালো না। আইএমএফ-এর শর্ত মেনে ঋণ নেওয়া হবে না। সাত দিনে এমন কী উন্নতি হলো যে আমরা তাদের শর্ত মেনে নিলাম।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাস শেষে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ২৭.৪২ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফ-এর হিসাবে ২২.০৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাড়ে ১০ মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। আর জুনের মধ্যে আইএমএফ দুই কিস্তির টাকা ছাড় করলে রিজার্ভ আরো বাড়ার আশা করছে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর রিজার্ভ দিয়ে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দায় দেনা শোধ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে রিজার্ভ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড গঠন করা হয়েছে। যদি কোনো সংকট হয় সেখান থেকেও সহায়তা দেওয়া হবে। ব্যাংকগুলো পরস্পরকে সহায়তা করবে। আর বাংলদেশ ব্যাংকের মনিটরিং থাকবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করতে পারবে।
‘নজরদারি দরকার’
যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমীন বলেন, “ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া ইতিবাচক। এতে অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায়। কিন্তু এই সুযোগে প্লেয়াররা ফেয়ার প্লে, না ফাউল খেলবে, সেটা দেখার আছে। রেফারি কারা সেগুলো নিয়ে একটা আশঙ্কা আছে।”
তিনি বলেন, “এক্সচেঞ্জ হাউজ, এমনকি ব্যাংকগুলো হলো বিদেশি মুদ্রার অ্যাগ্রিগেটর। তারা ডলার সংগ্রহ করে। তারা পরস্পরের খোঁজ নেয়। কার ডলার প্রয়োজন, কার কাছে ডলার আছে। তারা কম দামে কিনে অনেক বেশি দামে বিক্রি করতে পারে। আবার তারা ডলার জমিয়ে রেখে দাম বাড়াতে পারে। এখানে নজরদারি দরকার। আবার কয়েকটি ব্যাংকের হাতে যদি ডলার চলে যায় তাহলে তারাও মনোপলি সৃষ্টি করতে পারে। এখন ব্যাংক আর গ্রাহক যেহেতু ডলারের দাম নির্ধারণ করবে তাই ওপেন মার্কেটের নামে মনোপলি থকলে ডলারের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে। এখানে নজরদারি থাকতে হবে। তবে পরিস্থিতি বুঝতে কয়েকদিন সময় লাগবে।”
মো. নুরুল আমীন বলেন, “এখন সবচেয়ে বেশি ডলার আছে ইসলামী বাংকে। তারপরে কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক। অনেক ব্যাংক তাদের কাছ থেকে ডলার নিয়ে চলে। ফলে কোনো ব্যাংক যাতে রেমিট্যান্স হোল্ড করে না রাখতে পারেতার ব্যবস্থাপনা দরকার।”
সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “আমার কাছে সার্বিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ায় এখনই ডলারের দাম খুব বেশি বাড়বে না। হয়তো কিছুটা বাড়বে। তবে মূল্যস্ফীতিটা আরেকটু কমে এলে এটা করা হলে ভালো হতো। রিয়াল এফেকটিভ এক্সচেঞ্জ-এর যে হিসাব তার চেয়ে এখন ডলারের দাম এক-দুই টাকা কম-বেশি হচ্ছে। সেই বিবেচনায় ডলারের বাজার বেশ কিছুদিন ধরে স্থিতিশীলই আছে। ডলারের দাম বাড়বে, কমবে এটাই বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে কমিয়ে রাখা হয়েছে সেটা সঠিক নীতি না।”
আর বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “বৃহস্পতিবার থেকেই ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার নীতি কার্যকর হয়ে গেছে। আমাদের একাধিক টিম এর ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া মনিটরিং করছে। ডলারের বাজার স্থিতিশীল আছে।”