তুর্কি সিরিজের ১২ বছরের মহাকাব্যিক যাত্রার অবসান

দীর্ঘ ১২ বছরের সফল ও গৌরবময় পথচলা শেষে অনেকটা আকস্মিকভাবেই থমকে গেছে উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান নিয়ে নির্মিত ঐতিহাসিক এই মেগা প্রজেক্ট। সুলতান উসমানের উত্তরসূরি সুলতান ওরহানের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিরিজ ‘কুরুলুস ওরহান’ মাত্র এক সিজন চলার পরই চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

২০১৪ সালে ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ দিয়ে ইতিহাসনির্ভর তুর্কি ড্রামার যে মহাকাব্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ‘কুরুলুস উসমান’ হয়ে ওরহান পর্যন্ত পৌঁছালেও এবার বড় ধরনের ধাক্কা খেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। দর্শকপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই জয়যাত্রা হুট করে থমকে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তদের মাঝে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা।

তুর্কি ড্রামার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মূলে ছিল ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’। পাঁচ সিজন ধরে চলা এই সিরিজটি তুরস্কের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে এক অভাবনীয় উন্মাদনা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে আরব বিশ্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সিরিজটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, আরতুগ্রুল চরিত্রে অভিনয় করা এঙ্গিন আলতান দোজায়তান রাতারাতি বিশ্বতারকায় পরিণত হন।

বাবার পর ছেলের গল্প নিয়ে যখন ‘কুরুলুস উসমান’ শুরু হয়, তখন আরতুগ্রুলের বিশাল জনপ্রিয়তার পর উসমান হিসেবে বুরাক ওজচিভিতকে মেনে নেওয়া দর্শকের জন্য শুরুতে কিছুটা কঠিন ছিল। তবে টানা ছয়টি সিজন ধরে বুরাক তার অনবদ্য অভিনয় দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন দৃঢ়চেতা শাসকের চরিত্রে অনন্য। কুরুলুস উসমান সফলভাবে আরতুগ্রুলের সেই রাজকীয় গরিমা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

উসমানের পর সুলতান ওরহানের ইতিহাসনির্ভর সিরিজটি নিয়ে যখন ঘোষণা আসে, তখন ধারণা করা হয়েছিল এটিও অন্তত চার-পাঁচ বছর রাজত্ব করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে এই প্রজেক্টটি ব্যর্থ হয়েছে।

কেন্দ্রীয় চরিত্রে মের্ত ইয়াজজিউওলুর নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। একজন ঐতিহাসিক বীর যোদ্ধা ও শাসকের যে শারীরিক গঠন, ব্যক্তিত্ব বা গাম্ভীর্য পর্দায় ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন, তা মের্তের মধ্যে খুঁজে পাননি দর্শকরা। আগের সিরিজগুলোতে যুদ্ধের যে বিশাল রাজকীয় আয়োজন বা রোমাঞ্চকর দৃশ্যায়ন দেখা যেত, ওরহানে বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে তা ছিল অনুপস্থিত। চিত্রনাট্যের ধীরগতি এবং একই ধরনের পারিবারিক বা রাজনৈতিক সংঘাত বারবার ফিরে আসা দর্শকদের বিরক্ত করেছে। নতুন কোনো চমক না থাকায় তুরস্কের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর রেটিং দ্রুত কমতে থাকে।

ওরহান সিরিজ হঠাৎ বন্ধ ঘোষণার পেছনে শুধু নির্মাণের দুর্বলতা নয়, দর্শকদের মানসিক পরিবর্তনকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে একই ঘরানার তলোয়ারবাজি, তাঁবুর রাজনীতি আর প্রাচীন ষড়যন্ত্রের গল্প দেখতে দেখতে দর্শক এখন কিছুটা ক্লান্ত।

আধুনিক জীবনের এই টানটান গল্পের জোয়ারে স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়েছে দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক ফিকশন। আরতুগ্রুল দিয়ে যে সোনালী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ওরহানের আকস্মিক বিদায়ের পর তা কি চিরতরে হারিয়ে যাবে নাকি নতুন কোনো রূপ নিয়ে আবারও ফিরবে, সেটাই এখন বিশ্ব বিনোদন জগতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।