বিএনপি সরকারের রোষানলে পড়েছিল ‘মাটির ময়না’, প্রাচীকে দিতে হয় মুচলেকা

পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার তারেক মাসুদের জন্ম ৬ ডিসেম্বর ১৯৫৬, ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে। তার নির্মিত সাড়াজাগানো চলচ্চিত্রের মধ্যে “মুক্তির গান”, “মাটির ময়না”, “আদম সুরত”, “রানওয়ে” অন্যতম। মাটির ময়না (২০০২)-এর জন্য তিনি ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তার পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সোনার বেড়ি (১৯৮৫) এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে (২০১০)-এর জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। “কাগজের ফুল” চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের লোকেশন নির্বাচন শেষে গাড়িবহর নিয়ে ঢাকায় ফেরার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মারা যান তিনি। 

তারেক মাসুদের “মাটির ময়না”তে কাজ করেছেন অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। তিনি মাটির ময়না মুক্তি, সেন্সরশিপ, কান উৎসবে অংশগ্রহণ এবং সেই সময়ে তাকে যে ধরনের সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়েছে সেইসব বিষয় নিয়ে তারেক মাসুদের প্রয়াণ দিবসে কথা বলেছেন।

অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন এমন একটা সময়ে আমাকে সিনেমাটিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন, যখন আমার জীবনের খুবই বিপর্যস্ত সময় পার করছিলাম। এই সিনেমাটি আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।”

কান উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েও তৎকালীন “বিএনপি সরকারের রোষানলে” পড়ার স্মৃতির কথঅ বলতে গিয়ে রোকেয়া প্রাচী বলেন, “তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল, ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রটি সেন্সর বোর্ড থেকে আটকে দেওয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখনই কান উৎসবের আমন্ত্রণটি আসে। অভিনেত্রী হিসাবে আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি তখন শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করি। বিদেশ সফরের জন্য আমাকে শিল্পকলা থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে, কিন্তু তারা আমাকে ছাড়পত্র দেবে না। নানা রকম অসম্মানজনক আচরণ করছিল।”

সিনেমাটিতে অভিনয়ের কারণে “রাষ্ট্রবিরোধী” কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগ আনা হয় জানিয়ে রোকেয়া প্রাচী সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, “এ জন্য আমাকে মুচলেকা দিতে বলা হয়েছিল। তাছাড়া আমার ওপর তাদের রাগের আরেকটি কারণ ছিল শিল্পকলায় আমার চাকরিটা হয়েছিল তৎকালীন (১৯৯৬-২০০১) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে।”

অভিনেত্রী বলেন, “সরকারি চাকরিতে বিদেশ সফরের জন্য ছাড়পত্র নিতে হলে মুচলেকা দেওয়ার কোনো বিধি ছিল না। কিন্তু তারা আমাকে মুচলেকা দিতে বলেছিল, সেখানে লেখা ছিল- বিদেশে গিয়ে আমি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করব না। এটা একজন শিল্পী হিসাবে আমার জন্য খুবই অসম্মানের ছিল।”

মুচলেকা দিয়েই পরে কানে অংশ নিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এত বড় একটা আয়োজনে অংশ নেওয়া ছিল দেশের জন্য গৌরবের, সেটা চিন্তা করে মুচলেকা দিয়েই ছাড়পত্র নিয়েছিলাম। কিন্তু কান উৎসব থেকে ফেরার পর এই মুচলেকা দেওয়ার ব্যাপারটি আমাকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছিল। এ জন্য শিল্পকলার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম।”