সময়টা ১৯৬৭ সাল। পাকিস্তানে লিখিতভাবে নিষিদ্ধ করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। এরপর কেটে গেছে বহু সময়। এবার পাকিস্তানের জাতীয় টেলিভিশন এআরওয়াই-তে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে সাড়া ফেলেছেন বাংলাদেশী তরুণী সঙ্গীতশিল্পী শেখ দিনা।
ঢাকার নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক করা এই তরুণী বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তার সেই গানের গল্প তিনি তুলে ধরেছেন দ্য ডেইলি স্টারের কাছে।
এই শিল্পী বলেন, “যুক্তরাজ্যে বার্মিংহাম কনটেম্পরারি মিউজিক গ্রুপের জন্য গান করার সময় পাকিস্তানি সঙ্গীতশিল্পী আহসান বারী, গুল আহমেদ ও তুরাব আলীর দলের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তাদের সাউন্ডস অব কোলাচি নামে একটি ব্যান্ড রয়েছে।”
“সেখানে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশী লোক উৎসবে পাকিস্তানি শিল্পীদের পারফর্ম করার বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। ওই সময় তারাও জানায় তারা বাংলাদেশী কিছু শিল্পীকে তাদের উৎসবে পারফর্ম করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে চায়।”
মনে মনে এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি এই তরুণী। তিনি বলেন, “আমি ভাবছিলাম পাকিস্তানে আমার মাতৃভাষা উপস্থাপন করার এটি একটি দুর্দান্ত সুযোগ হবে।”
বর্তমানে দিনা টেক্সাসের মিডওয়েস্টার্ন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (এমবিএ) মাস্টার্স করছেন।
তিনি জানান, ন্যাশনাল একাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস (এনএপিএ) থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাওয়ার পর দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। আশপাশের অনেকেই পাকিস্তান সফরের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছিল।
দিনা বলেন, “আমাকে অনেকেই বলেছিল, পাকিস্তান গেলে অনেক দেশের ভিসা পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে এগুলো সঠিক নয়। কারণ পাকিস্তান ঘুরে এসে আমি কিন্তু এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসেই কথা বলছি। আমি বিশ্বাস করি একজন শিল্পীর বিশ্ব সীমাহীন।”
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান গঠন হয়। এরপরেই পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি ২০ বছরের মাথায় ১৯৬৭ সালে আইয়ুব খানের শক্তিশালী তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানের নির্দেশে সকল সরকারি মিডিয়াতে (রেডিও, টিভি, সরকারি সংবাদপত্র ইত্যাদি) তাকে নিষিদ্ধ করা হয়।
দিনা এর আগে যুক্তরাজ্য, ভারত, নেপালের মতো বিশ্বের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে অংশ নিয়েছেন।
কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আর্ট কাউন্সিল ইংল্যান্ডের সাথে তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি এমএসইউ টেক্সাসের অফিস অব গ্লোবাল এডুকেশনের গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডরও।
তিনি বলেন, “এই উদ্যোগটি ব্রিটিশ কাউন্সিল নিয়েছে। তারাই অর্থ দিয়েছে। সেখানে আমি পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করেছি ‘ঢাকা সে করাচি' নামে।”
জার্মানি, নেপালসহ ১৫ দেশের শিল্পীদের সঙ্গে ২০২০ সালের ৮ মার্চ পাকিস্তানের করাচিতে এনএপিএ (ন্যাশনাল একাডেমি অফ পারফর্মিং আর্টস) আন্তর্জাতিক লোক উৎসবে অংশ নেন দিনাও।
তিনি বলেন, “মঞ্চে উঠে দেখলাম বাংলাদেশের জন্য ঠিক করা জায়গাটিতে লাল ফুলের একটি বৃত্ত সাজানো হয়েছে। সেখানে আমি আমার হাত বান্ধিবি পা বান্ধিবি গানটি পরিবেশন করি। গান গাইতে গাইতে আমার চোখ জলে ভিজে ওঠে।
সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও যুদ্ধাপরাধের একটি উপস্থাপনাও ছিল। সেখানে কথাগুলো তাদের ভাষায় অনুবাদ করা ছিল। শ্রোতারা নিশ্চুপ হয়ে কথা শুনছিলেন।”
চট্টগ্রামে রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠার কথা উল্লেখ করে দিনা বলেন, “আমার শিল্পের প্রতি আবেগ ছিল। কিন্তু শুরুতে আমি পারিনি। ঢাকা আসার পরে আমার স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়।”
তিনি বলেন, “নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় অমিত রাজবংশী, এস এন টনভি, জাইম মুস্তাকিম, আজমাইন মাহতাব এবং ইনজাম্মামকে নিয়ে একটি ব্যান্ড গড়ে তুলি।”
পাকিস্তানে এক সপ্তাহ ছিলেন দিনা। উৎসবে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে পরিবার রেখে যাওয়া অনেকের সঙ্গে তার দেখা হয়। একজন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে তাদের কাছে আতিথেয়তায় মুগ্ধ তিনি।
দিনা বলেন, “পাকিস্তানের মাটিতে আমার মায়ের ভাষায় পারফর্ম করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। সেখানে অনেক বাঙালির গল্প আমাকে ছুঁয়ে গেছে।”
এই তরুণী বলেন, “আমি সেখানে একটি রেডিও শোতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়। মূলত একটি বাংলাদেশী মেয়ে গান গাইতে এসেছে শুনে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ওই বৃদ্ধ জানান, যুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানে কাজ করতেন তিনি। আর তার পরিবার ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লার কোথাও। তবে ঠিকানা মনে নেই তার। কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি। অনুরোধ করেন, কখনও তার পরিবার খুঁজে পেলে সেটি জানানোর।”
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যের যৌথ অর্থায়নে তৈরি করা “ঢাকা সে করাচি— এ টেল অফ টু লস্ট সোলস” ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায়। এতে দিনার পাকিস্তান ভ্রমণকে তুলে ধরা হয়েছে। দিনার যাত্রা, দেশটিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এতে উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিনার পারফরম্যান্সের ভিডিওটি অনেকেই শেয়ার করেছেন। রীতিমত ভাইরাল হয়েছে সেই ভিডিও।
দিনা বলেন, “আমি সেখানে ভ্রমণ করেছি, পাকিস্তানি সঙ্গীতশিল্পীদের দলের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ রয়েছে। ফলে আমি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরেছি। গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া বর্বরতার জন্য তারা লজ্জিত।”