শাকিব খান জমানায় নিশোর আগমনীবার্তা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাঙ্ক্ষিত দিন ফেরার ইঙ্গিত। ঈদের দিন থেকে রাজধানীসহ সারা দেশের সিনেমা হলে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এবার নতুন নায়ক হিসেবে পেয়েছে আফরান নিশোকে। তাকে চলচ্চিত্রেরও “লম্বা রেসের ঘোড়া” ভাবছেন অনেকেই।

ছোট পর্দার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আফরান নিশোর এই অভিষেককে ঘিরে উন্মাদনা লক্ষণীয়। মাল্টিপ্লেক্স থেকে সিঙ্গেল স্ক্রিনের সিনেমাহল- তার অভিনীত “সুড়ঙ্গ” সবখানেই হাউজফুল। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে তার জন্মভূমিতে কোনো সিনেমাহল না থাকায় স্বাধীনতা কমপ্লেক্সকে বানানো হয়েছে অস্থায়ী সিনেমাহল। দর্শক চাহিদা থাকায় সিরাজগঞ্জের রুটস সিনেক্লাব রাত ১টায় “বিশেষ ভিআইপি শো” চালিয়েছে। বলা যায়, প্রথম সিনেমা দিয়েই ছক্কা হাঁকিয়েছেন নিশো।

আফরান নিশোর ঝুলিতে আছে শোবিজে ২০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা। তিনি আগে থেকেই দর্শকমহলে পরীক্ষিত। এছাড়া তার ভক্ত-ফলোয়ারও প্রচুর, যারা “নিশোয়ান” নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে প্রিয় তারকাকে সিনেমায় দেখার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

পরিচালক রায়হান রাফীর দাবি, “সিনেপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিনের সিনেমা হলে আমাদের ‘সুড়ঙ্গ' একদিনও হাউজফুল ছাড়া যায়নি। কেরানীগঞ্জের লায়ন সিনেমাহল ‘পরাণ' দিয়ে ২০০ দিনে যত আয় করেছিল, ‘সুড়ঙ্গ' ১০ দিনে সেই অঙ্ক অতিক্রম করেছে। কতটা জোয়ার একবার ভাবুন।”

তিনি মনে করেন, “একজন নায়কের প্রথম সিনেমায় এই সাফল্য অকল্পনীয়। আমার মনে হয়, খুব কম অভিনেতার কপালে এমন রাজকীয় অভিষেক জোটে। সাধারণত একটি সিনেমার দর্শক নির্দিষ্ট বয়সসীমার হয়ে থাকে। কিন্তু ‘সুড়ঙ্গ'র দর্শক তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ বিভিন্ন বয়সী। এটাই একজন অভিনেতার বড় সাফল্য। সব বয়সীদের মধ্যে আফরান নিশোকে ঘিরে আগ্রহ কাজ করে। তাই এখন থেকে নিয়মিত সিনেমায় কাজ করা উচিত তার।”

যদিও সুড়ঙ্গর প্রচারণার সময় আফরান নিশো বলেছেন, “সিনেমার ক্ষেত্রে আমাকে বেশি কাজ করতে হলে পারবো না। পুরো বছরে একটা সিনেমা হলে ঠিক আছে। এটা এমন না যে, চাইলেই করে ফেললাম। আমি যে মেজাজের, কিংবা যে ধাঁচের সিনেমা করতে চাই, সেজন্য পুরো টিমের একত্রিত হওয়া জরুরি। ভালো স্ক্রিপ্ট কিংবা ভালো পরিচালক হলেই কাজ করে ফেলবো, এমন হবে না। সেভাবে আমার ক্যালেন্ডার সাজিয়েছি যে, আমি এক-দেড় বছরে কী কী সিনেমা করবো ও কীভাবে করবো।”

ঈদ-উল-আজহায় সুপারস্টার শাকিব খানের নতুন সিনেমা “প্রিয়তমার” সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করেছে নিশোর “সুড়ঙ্গ”। দুই তারকার ভক্তকুল “শাকিবিয়ান” ও “নিশোয়ান”-ও পাল্টাপাল্টি মন্তব্যে লিপ্ত হয়ে “বাজার গরম” করেছে।

এমনিতেই ঢালিউডে নতুন নায়ক এলে শাকিবের বিকল্প ভাবা শুরু হয়। নিশোর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ এই প্রবণতাকে স্বাভাবিকই মনে করেন, “শাকিব রাজত্ব করছে দীর্ঘদিন ধরে। এক বনে এক রাজা ছাড়া আর কেউ নেই। ফলে নতুন কেউ এলে তার সঙ্গে তুলনা হবে, এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। যেহেতু আর কেউ নেই। যদি ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ জন শাকিব থাকতো, এই তুলনার চেষ্টা কিন্তু দেখা যেতো না।”

রায়হান রাফীর মতে, “কেউ কারও বিকল্প হতে পারে আমি এটা বিশ্বাস করি না। বিকল্প হওয়ার প্রয়োজনও নেই। সবাই সবার জায়গায় সেরা। আমার মনে হয়, একটা ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন শাকিব খান জরুরি, তেমনই আফরান নিশোকে প্রয়োজন, একইভাবে সিয়াম আহমেদকে দরকার। তাহলেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।”

একই অভিমত পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিমের, “এক-দুইজন দিয়ে তো আর ইন্ডাস্ট্রি চলে না, ইন্ডাস্ট্রির জন্য অনেক লোক দরকার।”

ঢালিউডে গত ১৫ বছরের পরিসংখ্যানে তাকালে দেখা যায়, অনেক সুদর্শন নায়ক সম্ভাবনা জাগিয়ে এসেছেন। আফরান নিশোর আগে ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় এসে নজর কেড়ে নেওয়া সর্বশেষ অভিনেতা সিয়াম আহমেদ। ২০১৮ সালে জাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রযোজনায় রায়হান রাফীর “পোড়ামন ২” সিনেমার মাধ্যমে রুপালি পর্দায় পা রাখেন তিনি। একই বছর রায়হান রাফীর পরিচালনায় এই তরুণের আরেক ছবি “দহন” প্রশংসিত হয়। এরপর সিয়ামের আরও আটটি সিনেমা মুক্তি পেলেও আহামরি সাফল্য পায়নি। তবে তার ঝুলিতে যোগ হয়েছে সেরা অভিনেতা বিভাগে দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

সিয়ামের পর শরিফুল রাজকে নিয়ে ঢালিউডে বেশ মাতামাতি হয়েছে। ২০১৬ সালে রেদওয়ান রনির “আইসক্রিম” সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হলেও “পরাণ” (২০২২) তাকে লাইমলাইটে এনেছে। এরপর “হাওয়া”-র (২০২২) সুবাদে তার জনপ্রিয়তার পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। যদিও ব্যক্তিজীবনের বিতর্কের মেঘ কখনোই তার পিছু ছাড়েনি, তারপরও তাকে নিয়ে এখনো নির্মাতারা আশাবাদী।

গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মন্তব্য, “ইন্ডাস্ট্রিতে একজন অভিনেতা প্রতিষ্ঠিত হতে অন্তত ১০ বছর সময় লাগে। শরিফুল রাজের সিনেমার ক্যারিয়ার মাত্র তিন বছরের। চার-পাঁচটি সিনেমায় কাজ করেছে সে। তাকে সময় দিতে হবে। একটা সিনেমা ভালো গেলে একটা সিনেমা খারাপও যেতে পারে। কিন্তু এজন্য কাউকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া যাবে না। সবসময় তো একই তালে চলা যায় না। ক্রিকেটারদের ফর্ম কি খারাপ যায় না? আবারও ভালো ফর্মে ঠিকই ফেরেন তারা। সবক্ষেত্রে ব্যাপারটা একই রকম। রাজ ও নিশো যথেষ্ট সম্ভাবনাময়, তাদের সঠিক সময়ে জুতসই ছবিতে নির্বাচন করতে হবে। সময়ই বলবে তারা ধারাবাহিকতা রাখতে পারবে কি পারবে না।”

নিশো, সিয়াম, রাজ- তিন তারকারই প্রথম ব্যবসাসফল সিনেমার পরিচালক রায়হান রাফী। তিনি বলেন, “আমার প্রতিটি সিনেমায় এমন কাউকে আনার চেষ্টা করেছি, যাদের ইন্ডাস্ট্রিতে দরকার।   সিয়ামকে আমি নিয়েছিলাম, এরপর সে ইন্ডাস্ট্রিকে অনেক সিনেমা দিয়েছে। তার মানে ইন্ডাস্ট্রির লাভ হয়েছে। রাজের ক্ষেত্রে যেমন ‘পরাণ' টার্নিং পয়েন্ট। এরপর ‘হাওয়া' হিট হয়েছে। এর পেছনে ‘পরাণ'-এর একটা পরোক্ষ অবদান ছিল। দর্শকদের হলমুখী করেছিল ‘পরাণ', একইসঙ্গে রাজের আলাদা দর্শক তৈরি হয়েছে। আপনি যদি খেয়াল করেন, ভারতের সিনেমা সুপারহিট করার ক্ষেত্রে নায়ক বড় ভূমিকা রাখে। বলিউডে ‘পাঠান', দক্ষিণী সিনেমায় ‘পুষ্পা' কিংবা ‘কেজিএফ' নায়ককেন্দ্রিক বলেই এত বিপুল ব্যবসা করেছে। নায়ক থাকলেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ভালো থাকে। যখন নতুন নায়ক সাফল্য পায়, তখন সুবিধা হলো, আরও ২০ জন প্রযোজক-পরিচালক সিনেমা নির্মাণে আকৃষ্ট হন। তাদের মনে হতে থাকে, ভালো কন্টেন্ট হলে নতুনরাও হিট সিনেমা দিতে পারে।”

এর আগে জাজ মাল্টিমিডিয়ার হাত ধরেও কয়েকজন নায়কের অভিষেক হয়েছে। তাদের মধ্যে ২০১২ সালে “ভালোবাসার রঙ” ছবির মাধ্যমে ঢালিউডে যুক্ত হন বাপ্পি চৌধুরী। এরপর গত ১১ বছরে ৩৭টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে তার। তবে শুরুর দিকের সাফল্য পরবর্তী সময়ে ধরে রাখতে পারেননি তিনি।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত “রক্ত” সিনেমা দিয়ে ঢালিউডে নাম লেখান জিয়াউল রোশান। এরপর তিনি অভিনয় করেছেন ১০টি সিনেমায়। এগুলোর বেশিরভাগই জাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রযোজনায়। কিন্তু কোনোটিই আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারেনি।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার আরেক “উপহার” সাইমন সাদিক। ২০১২ সালে জাকির হোসেন রাজুর “জ্বী হুজুর” ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় এলেও জাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রযোজনায় একই পরিচালকের ব্যবসাসফল “পোড়ামন” (২০১৩) তাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর আর সেই অর্থে সফলতা পাননি তিনি। যদিও তার পালকে যুক্ত হয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি।  এবারের ঈদ-উল-আজহায় মুক্তিপ্রাপ্ত তার “লাল শাড়ি” খুব একটা চলেনি।

ধারাবাহিকভাবে ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিতে না পারলেও জাজ মাল্টিমিডিয়ার হাত ধরে পথচলা শুরু করা বেশিরভাগ চিত্রনায়ক নির্মাতাদের কাছে চাহিদা তৈরি করতে পেরেছেন। এর নেপথ্যে পরিকল্পনা ছিল বলে জানিয়েছেন জাজ মাল্টিমিডিয়ার স্বত্বাধিকারী আব্দুল আজিজ।

তিনি বলেন, “কোনো প্রযোজক যদি নতুন নায়ক আনে, তাহলে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। বেশিরভাগ প্রযোজকেরই এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিকল্পনা থাকে না। এ কারণে অনেকে অভিষেকের পর তেমন একটা সুবিধা করতে পারে না। নতুন নায়কেরা পরিচালক নির্বাচন থেকে শুরু করে স্ক্রিপ্ট বাছাই পর্যন্ত অনেক কিছু বোঝেন না ঠিকমতো। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না তারা।”


“প্রিয়তমা” সিনেমার পোস্টারে শাকিব খানের ফার্স্ট লুক/ফেসবুক


মাহফুজ আহমেদ অবশ্য অনেক নায়কের জ্বলে উঠেই হারিয়ে যাওয়ার জন্য দুষলেন পুরো প্রক্রিয়াকে, “একজন অভিনেতা আসার পর তৈরি হতে পারবে কিংবা ধীরে ধীরে একসময় তারকা হতে পারবে, এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নেই। সেই ইন্ডাস্ট্রিই তো আমাদের নেই। আগে একটি ইন্ডাস্ট্রি হতে হবে, তারপর এগুলো আসবে। একজন অভিনেতা তো নিজে নিজে তৈরি হয় না, এজন্য একটি প্ল্যাটফর্মে তাকে পড়তে হয়। ভালো গল্প ও পরিচালকের হাতে পড়ে তারপর অভিনেতা তৈরি হয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি যদি যথাযথ আকারে থাকতো, তাহলে নতুন অভিনেতাকে অভিবাদন জানানো হতো, যেটি বাইরের ইন্ডাস্ট্রিগুলো করে। সেখানে একটা নতুন ছেলে এলে তাকে অভিবাদন জানাতে হয়। এটা তাকে চলার পথে অনুপ্রাণিত করে। যেহেতু আমাদের ইন্ডাস্ট্রির কাঠামো নেই, এ কারণে নিশো বড় পর্দায় আসার পর উল্টো আক্রান্ত হতে শুরু করলো।”

একসময় ধারণা করা হতো, নাটক থেকে সিনেমায় এসে কেউ সফল হতে পারবে না। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া সেই ধারণা ধীরে ধীরে ভেঙেছে। এখন ছোট পর্দার তারকাদের নিয়েও লগ্নি করার সাহস পাচ্ছেন প্রযোজকরা। সেই তালিকায় সবচেয়ে বড় আশার নাম চঞ্চল চৌধুরী। তৌকীর আহমেদের “রূপকথার গল্প” (২০০৬) দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করা এই অভিনেতা “মনপুরা” (২০০৯) ছবির মাধ্যমে ঢালিউড কাঁপিয়ে দেন। এরপর অমিতাভ রেজার “আয়নাবাজি” (২০১৬), অনম বিশ্বাসের “দেবী” (২০১৮) ও মেজবাউর রহমান সুমনের “হাওয়া” (২০২২) ব্যবসাসফল হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ প্রযোজক-পরিচালক নতুন নায়কদের সুযোগ দিয়ে বাজি ধরতে চান না। “সুড়ঙ্গতে” নিশোকে নিয়ে বাজি ধরেছে আলফা-আই স্টুডিওস ও চরকি। কৃতিত্বটা রায়হান রাফীকে দিতেই হবে।

তিনি বলেন, “আমি প্রতিটি সিনেমায় একেকজনকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। আমার যে তিনটি সিনেমা ব্লকবাস্টার হয়েছে, সেগুলোতে নতুন কেউ কিংবা আগে হিট সিনেমা দিতে পারেনি এমন নায়ক কাজ করেছেন। অন্যদেরও এভাবে কাজ করা প্রয়োজন। যদিও বাংলাদেশের খুব কম পরিচালক এভাবে চিন্তা করেন। কোনো নায়ক হিট হলে তারপর সবাই তাকে নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। যেমন অনেক নির্মাতারই প্রথম সিনেমার নায়ক চঞ্চল ভাই। কারণ, ‘মনপুরা'র মাধ্যমে তিনি ইতিহাস সৃষ্টির পর টানা হিট সিনেমা দিয়েছেন। অমিতাভ রেজার প্রথম সিনেমা ‘আয়নাবাজি', অনম বিশ্বাসের প্রথম সিনেমা ‘দেবী', মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম সিনেমা ‘হাওয়া'র নায়ক চঞ্চল ভাই। তাদের কেউই কিন্তু নতুন কাউকে টেনে এনে ঝুঁকি নেননি।”

মুদ্রার একপিঠে যদি ইতিবাচক ব্যাপার থাকে, অন্যপিঠে আছে ব্যর্থতার হতাশা। সেদিকে তাকালে বোঝা যায়, ছোট পর্দার জনপ্রিয় অনেক মডেল-অভিনেতা বড় পর্দায় এসে সফল হননি। যেমন জিয়াউল ফারুক অপূর্বর একমাত্র সিনেমা “গ্যাংস্টার রিটার্নস” (২০১৫) ব্যবসা করতে পারেনি। আব্দুন নূর সজলের প্রথম দুই সিনেমা “নিঝুম অরণ্যে” (২০১০) ও “রান আউট” (২০১৫) ছিল ফ্লপ।

ছোট পর্দার পাঠ চুকিয়ে ২০০৯ সাল থেকে চলচ্চিত্রে কাজ করছেন চিত্রনায়ক নিরব হোসেন। গত ১৪ বছরে ৩৫টি ছবি মুক্তি পেয়েছে তার। কিন্তু কোনোটিই সেই অর্থে আহামরি ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। এবারের ঈদ-উল-আজহায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ক্যাসিনো'র জন্য অবশ্য বেশ বাহবা কুড়িয়েছেন তিনি।

২০০৭ সালে তৌকীর আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ' ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় ইমনের। একই বছর চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসের বিপরীতে ‘এক বুক ভালোবাসা'য় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর ৪০টি সিনেমা মুক্তি পেলেও কোনোটিই ব্যবসায়িকভাবে আহামরি কিছু করতে পারেনি।

২০১০ সালে খিজির হায়াত খানের “জাগো” সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউডে যাত্রা শুরু করেন আরিফিন শুভ। গত ১৩ বছরে তার ২০টি সিনেমা মুক্তি পেলেও দীপংকর দীপনের “ঢাকা অ্যাটাক” (২০১৭) ছাড়া কোনোটিই সেই অর্থে সাড়া ফেলতে পারেনি।

শাকিবের সঙ্গে আরিফিন শুভ ও বাপ্পি চৌধুরীর তুলনা হয়েছে অনেকদিন। তাদের মধ্যে সেই সম্ভাবনা শুরুতে দেখেছিলেন নির্মাতারা। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই তুলনা দৃশ্যত “অসম” বলে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রযোজক আব্দুল আজিজ খুঁজে ব্যাখ্যা করেছেন এর কারণ, “বাপ্পি জাজ মাল্টিমিডিয়ার ব্যানারে অনেক ছবিতে কাজ করেছেন এবং সবই হিট ছিল। পরে বাপ্পি বাইরের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সিনেমায় কাজ শুরুর পর তার বাজার নেমে গেল। সেগুলো তেমন চললো না। এজন্য বাপ্পিকেই দোষ দেবো। কারণ, তিনি বুঝতে পারেননি কোন ছবিতে অভিনয় করবেন আর কোনটিতে করবেন না। নিজের সামর্থ্য জানা ছিল না তার। এ কারণে তিনি সব ধরনের ছবিতে কাজ করতে থাকলেন এবং শেষমেষ তার বাজার পড়ে গেল। বাপ্পির মতো একই ‘দোষ' আরিফিন শুভরও। তিনিও সঠিক গল্প বাছাই করতে পারেননি। তবে সিয়াম একটু আলাদা। বর্তমানে শাকিবের পরেই কিন্তু সিয়ামের অবস্থান। তিনি ছাড়া কেউই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, সেসব বুঝতে পারছেন না তারা। এজন্য সিনিয়রদের কাছ থেকে নির্দেশনা নেওয়া দরকার।”

গিয়াস উদ্দিন সেলিম অবশ্য ছোট পর্দা ও বড় পর্দার ভেদাভেদ মানতে নারাজ। তার কথায়, “কেউ ছোট পর্দা থেকে এসেছেন কিংবা বড় পর্দা থেকে এসেছেন, এমন বৈষম্য আমার পছন্দ নয়। কারণ, ছোট পর্দা ও বড় পর্দার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। হয়ত প্রস্তুতিটা একটু ভিন্ন। আমরা যত বৈষম্য করবো ততই ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি। কারও সিনেমা সফল হলে উদযাপন করুক, অন্যের সিনেমা নিয়ে টানাটানি করার তো দরকার পড়ে না। আমরা যারা টেলিভিশন অঙ্গনে আছি, একটু বাস্তবসম্মত সিনেমার দিকে আমাদের ঝোঁক বেশি। একজন মানুষ মেরে ৩০ জনকে কুপোকাত করে দেয়, এমন দৃশ্য নিয়ে বানানো সিনেমা বাস্তবসম্মত লাগে না আমার কাছে। আমার নিজস্ব একটি ভঙ্গি আছে।”

২০১৮ সালে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের “স্বপ্নজাল” সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় ইয়াশ রোহানের। অভিনেতা নরেশ ভূঁইয়া ও শিল্পী সরকার অপুর ছেলে তিনি। তার অভিনীত সিনেমার মধ্যে কেবল “পরাণ” (২০২২) ব্যবসা করতে পেরেছে।

২০১১ সালে “বেইলি রোড” ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নিলয়ের। এরপর চারটি সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু সেগুলো সাড়া জাগায়নি। ২০১৫ সালে শফিকুল ইসলাম খানের “অচেনা হৃদয়” ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় এবিএম সুমনের। “ঢাকা অ্যাটাক” (২০১৭) ছবির সুবাদে আলোচনায় আসেন তিনি। তার অভিনীত তিনটি ছবি মুক্তি পেলেও ব্যবসাসফল হয়নি।

টিভি পর্দা থেকে সেলুলয়েডে ব্যস্ত হয়ে ওঠা আরেক অভিনেতা আদর আজাদ। “তালাশ” (২০২২) দিয়ে তার শুরু। এরপর আরও তিনটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে আদরের। এগুলো তেমন সফল না হলেও তাকে নিয়ে আশাবাদী অনেকে।

ঢালিউডে ২০১০ সালে “খোঁজ দ্য সার্চ” সিনেমা দিয়ে আসেন অনন্ত জলিল। কিন্তু তার ছবি যত গর্জে তত বর্ষে না কখনও। জায়েদ খানও পর্দার বাইরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে বেশি আলোচিত। সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকজন নায়কের অভিষেক হয়েছে বড় পর্দায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুমিত সেনগুপ্ত, শিপন মিত্র, কায়েস আরজু, আমান রেজা, আসিফ নূর, সাব্বির আহমেদ, শান্ত খান, জয় চৌধুরী, সাগর, রোজ, শাহরিয়াজ, সাঞ্জু জন। তারা কেউই ক্যারিয়ার তেমন সমৃদ্ধ করতে পারেননি। দর্শকদের হলমুখী করতে না পারায় তাদের ঘিরে আশা ও সম্ভাবনা এফডিসির আকাশে বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেছে। দর্শকদের সিনেমাহলে টানার মতো অভিনয়ে এমন কোনো বৈচিত্র্য দেখাতে পারেননি তারা। তাই আশাহত হয়েছেন নির্মাতারা।

প্রশ্ন জেগেছে, আফরান নিশো নায়ক হিসেবে ধারাবাহিকভাবে কতটা ভরসা হতে পারবেন? মধুমিতা সিনেমাহলের স্বত্বাধিকারী ইফতেখার উদ্দিন নওশাদের দৃষ্টিতে, “আফরান নিশোর সম্ভাবনা অনেক বেশি। এছাড়া সিয়াম আহমেদ ভালো কাজ করেন। এ তালিকায় আরিফিন শুভকেও রাখা যায়। তাদের সবারই সম্ভাবনা আছে। তারা যদি কাজটিকে সিরিয়াসভাবে নেন তাহলে সবারই সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী। আমাদের কন্টেন্ট ভালো হলে দর্শকের অভাব হবে না।”

দীর্ঘদিন ছোট পর্দায় কাজ করে বড় পর্দায় প্রশংসা কুড়ানো মাহফুজ আহমেদ দারুণ সম্ভাবনাময় মনে করেন নিশোকে। এবারের ঈদে চয়নিকা চৌধুরীর “প্রহেলিকা” সিনেমার মাধ্যমে দীর্ঘ আট বছর পর বড় পর্দায় ফিরেছেন তিনি।

তার কথায়, “নিশো মাত্র এসেছে। প্রথম সিনেমা করেছে। শুধু সম্ভাবনাময় না, নিশো কিন্তু তৈরি হওয়া। একজন অভিনেতা হিসেবে সে কতটা যোগ্যতা অর্জন করেছে আমরা জানি। এখন তাকে ব্যবহার করতে জানতে হবে। যদি ব্যবহার করা না যায় তাহলে নিশোর দোষ দিয়ে লাভ নেই। তখন দোষ দিতে হবে ইন্ডাস্ট্রিকে, প্রক্রিয়াকে। আমি কখনও অভিনেতাদের দোষ দেই না। অভিনেতা তৈরি হন পরিচালকের হাতে। আর পরিচালকেরা কাজ করেন পেশাদার প্ল্যাটফর্মে থেকে।”

রায়হান রাফী বলেন, “আফরান নিশো প্রথম সিনেমা দিয়েই ইন্ডাস্ট্রি নাড়িয়ে দিয়ে বোঝালেন, তিনি ঢালিউডে থাকতেই এসেছেন। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। আমাদের এমন একজন অভিনেতা দরকার ছিল, যিনি সব রকমের চরিত্রে মানিয়ে নিতে পারেন। তিনি যদি নিয়মিত বড় পর্দায় থাকেন তাহলে সিনেমাহল মালিকদের ব্যবসায় জোয়ার আসবে। ফলে সিনেমাহল আরও বাড়বে। আমাদের দেশে সিনেমাহলের সংখ্যা ১০০তে নেমে এসেছে। অথচ সিনেমার স্বর্ণযুগে আমাদের সিনেমাহল ছিল তিন হাজারের বেশি। এর কারণ নোংরা রাজনীতি ও নায়ক সংকট। একসময় আমাদের মনে হতো, দেশে সিনেমা আর চলবে না। এখন সিনেমা চলতে শুরু করায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ভাবাই যায়।”

চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা মনে করেন, চিত্রনায়কদের কাতারে এখনও শীর্ষে শাকিব খান। কারণ নির্মাতারা তাকেই ট্রাম্পকার্ড হিসেবে দেখেন। দর্শকমহলে গ্রহণযোগ্যতা আছে বলেই তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে। সিনেমাহলে তার অভিনয়, সংলাপ, অ্যাকশন দেখে একশ্রেণির দর্শক মুগ্ধ হয়। ২৪ বছর ধরে সেই চিত্রই দেখা গেছে। হিমেল আশরাফ পরিচালিত “প্রিয়তমা” এর সর্বশেষ উদাহরণ।

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদের কথায়, “শাকিব খান অনেকের সঙ্গে অভিনয় করে পরিণত হয়েছেন। নতুন নায়কদের পুরোপুরি সিরিয়াস থাকতে হবে। কাজকে একদম সিরিয়াসলি নিতে হবে। টাকা-পয়সা আসবে ঠিক আছে, কিন্তু নিজের একটা প্রভাব রেখে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে কিছু দিয়ে যেতে হবে। দুই-তিনটা সিনেমা হিট হলেই যদি কেউ নিজেকে সুপারস্টার মনে করে তাহলে ঠিক হবে না। পরিচালক-প্রযোজকদের কাছে শুনি, অনেকে আছেন এমন ব্যবহার করেন।”

শাকিবের ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা “অনন্ত ভালোবাসা”-র (১৯৯৯) পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান মনে করেন, “নায়ক সংকট এখনো কাটেনি। ঈদ ছাড়া ব্যবসা দিতে পারে এমন নায়ক আরও দরকার আমাদের। নায়কদের মধ্যে নিবেদন থাকতে হবে। নিজেদের ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। রাজ্জাক, সোহেল রানা ও আলমগীর যেমন ছিলেন, তেমন মান বজায় রাখতে হবে।”