বাস্তব জীবনেও ‘কড়ক সিং’য়ের নয়নার মতো হতে চান জয়া

ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি ফাইভ-এ ৮ ডিসেম্বর মুক্তি পাচ্ছে জয়া আহসানের প্রথম বলিউড ছবি “কড়ক সিং”। বহুল প্রশংসিত “পিংক” এবং “লস্ট”-এর পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর নির্দেশনায় নির্মিত এই হিন্দি ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র কড়ক সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন পঙ্কজ ত্রিপাঠী। ছবিতে “নয়না” হিসেবে দেখা যাবে অভিনেত্রী জয়া আহসানকে। 

ছবি মুক্তি পাওয়ার ঠিক আগে আগে উৎকণ্ঠা মেশা রবিবারে, কলকাতায় একান্ত আলাপচারিতায় ঢাকা ট্রিবিউনকে জয়া বললেন, “আমি কড়ক সিংয়ের নয়নার মতো হতে চাই।”

বলা ভালো, এই নয়না (জয়া) বলিউডের আকস্মিক এক আবিষ্কার। বলিউড উন্মোচন করছে অন্য এক জয়া আহসানকে। উদঘাটন করছে তার শিল্পী প্রতিভাকে। বলিউডে পা রেখে, শিল্পীও উদ্ভাবন করেন তার নবলব্ধ কিছু গুণকে।

বলিউড এক বৃহৎ বট গাছের মতো। তার শাখা-প্রশাখা দুনিয়ার নানা প্রান্তের ভূগোলে ছায়া ফেলে - অথচ তারা ন্যুব্জ হয় না। সে বট গাছের মূল বড় গহীনে, গভীরে বিস্তৃত। বট গাছপ্রায় বলিউডে বাসা বাঁধে নানা ডানার পাখি। এই বলিউডই লালন করে বৈচিত্র্যের। জায়গা করে দেয় বৈপরীত্যের। দুনিয়ার নানা দেশে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থাকলেও এই বৈপরীত্যর কদর সবাই করতে পারে না।

জয়া আহসান/ফেসবুক

“একজন শিল্পী যতই তার দিগন্তকে প্রসারিত করতে পারে ততই ভালো বলিউডে ঠিক চ্যালেঞ্জই যেমন বেশি তেমনি সুযোগও অনেক,” বলেন জয়া। 

সম্প্রতি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে তার “পেয়ারার সুবাস (২০২৩)” বা “সেন্ট অব সিন”। নুরুল আলম আতিকের সঙ্গে এটি তার দ্বিতীয় কাজ ।

কোন সেই ছোটবেলায় সমাজের চিরায়ত ধারাকে “না” বলতে শিখেছেন। তারপর পেরিয়ে চলেছেন একের পর একের গণ্ডি। বাংলাদেশের এক অভিনেত্রীর বলিউড এবং ইরানিয়ান ছবিতে কাজ করে খ্যাতি অর্জন করা অবশ্যই বিস্ময়ের। তার অনুরাগীদের বিহ্বল করায়।

কখনো নয়না থেকে দেবী, কখনো বিলকিস বানু কখনো কুসুম। এত চরিত্রে যাপন করার মাঝে জয়া নিজেকে খুঁজে পান? নয়না, দেবী, বিলকিস বানু- এরা কি কালের বহতায় এবং ঘটনার দুর্নিবার স্রোতে হারিয়ে যায়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এক প্রাণোচ্ছ্বল জয়াকে দেখতে পান ভক্তরা/ফেসবুক

জয়া বলেন, “যত বড় অভিনেতা হোন না কেন, শক্তিশালী চরিত্রগুলো তাদের মধ্যে থিতিয়ে থাকে। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই অভিনেত্রী “গেরিলা”র বিলকিস বানুর মতো সাহসী হয়ে উঠতে চান। ‘‘অর্ধাঙ্গিনী’’র মেঘনার মতো সহনশীল হতে চান। দেবীর চরিত্রের মতো আধ্যাত্মিক হয়ে উঠতে চান। ‘‘পুতুল নাচের ইতিকথা”র কুসুমের মতো স্বাবলম্বী এবং সাহসী হয়ে উঠতে চান। সব চরিত্রের ধারগুলো একটু একটু এক অনন্য মহিমার আধার হয়ে উঠতে চান। 

“কড়ক সিং” ছবিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে জয়া বলে ওঠেন, “টনি দা (পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী) আমাদের সমস্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি করে দেন।”

ঠিক জয়া আহসানই কেন এই চরিত্রের জন্য এর উত্তর দিতে গিয়ে পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী এই প্রতিবেদককে জানান, জয়া আহসানের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। কোভিড মহামারির অন্তিম লগ্নে যখন কড়ক সিং এর নয়নার কথা ভাবতে থাকেন প্রথমেই জয়ার মুখ ভেসে ওঠে। “জয়ার চোখের মধ্যে একটা নীরবতা আছে। একটা নিস্তব্ধতা আছে। যখন চুপ থাকে, কিছু বলেই না - ওর চোখ অনেক কিছু বলে দেয়, ” পরিচালক বলে ওঠেন।

অন্য কলাকুশীলকদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্ববান পঙ্কজ ত্রিপাঠী কখনো বুঝতেই দেননি যে তিনি অত বড় একজন অভিনেতা। জয়ার কথায়, “তিনি ভীষণ রকমের সাধারণ মানুষ। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে সব কুশীলবদের সঙ্গে আলোচনা হতো তার বিহার থেকে উঠে আসার গল্প। তার স্ট্রাগলের গল্প।”

“বড়দের কাছ থেকে আমি অনেক অনেক কিছু শুনি। শুনে শুনেই তো আমরা সমৃদ্ধ হই।”

রবিবারের সান্ধ্য আলাপচারিতায় জানালেন, “পড়তে প্রচণ্ড ভালোবাসেন এই অভিনেত্রী।  রাহুল সাংকৃত্যায়ন থেকে গার্সিয়া লোরকা আছে তার পছন্দের তালিকায় । ঝুম্পা লাহিড়ী এবং মার্কেজ তার বড় প্রিয়। প্রিয় সাহিত্যিকের সূচি বেশ সুদীর্ঘ এবং তারা নানা ঘরানার। প্রথমেই বললেন নবারুণ ভট্টাচার্যের নাম। ঘণ্টাখানেকের কথকতায় বললেন হুমায়ূন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, জয় গোস্বামী, সৈয়দ শামসুল হকদের লেখা পড়ে মোহিত হওয়ার কথা।

“পড়াশোনা মানুষের কল্পনাশক্তিকে থেকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরাও দেখতে পান, আমি যখন দৃষ্টিহীন চরিত্রে অভিনয় করি তখন দারুণভাবে বিষয়টা বুঝতে পারি।”

কথায় কথায় বলে উঠলেন, “আমি সংবেদনশীল মানুষ পছন্দ করি।”

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে জয়া বলেন, ভালো-নিখুঁত ছবির সঙ্গে সঙ্গে ঊন, অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ ছবি বাংলাদেশে অনেক হয়।

জয়া আহসান/ফেসবুক

তবে তার কথায়, এই ত্রুটিপূর্ণ ছবির মধ্যে একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। এই ইমপারফেক্ট কাজগুলোও বাংলাদেশের কাছে অস্মিতার। অহমের। 

কৈশোরে কাঠমিস্ত্রি হওয়ার ইচ্ছে ছিল জয়ার। সেই কিশোরী দেশের অন্যতম অদম্য এবং মনমোহিনী অভিনেত্রী হয়ে ওঠার অনেকগুলো অনুগল্প শোনালেন তিনি । 

জীবনের প্রায় পুরোটা নগরকেন্দ্রিক হলেও, বাংলাদেশের গ্রাম তার বড় প্রিয়। গোপালগঞ্জের রাস্তাঘাট তার ভালো লাগে। ভালো লাগে চট্টগ্রাম এবং বান্দরবান। কবে কোন এককালে রংপুরের কোথাও দিগন্ত প্রসারিত সেনাদের মতো সংঘবদ্ধ থাকা সোনালি গমের খেতে দাঁড়িয়ে সুদীর্ঘ ট্রেনের দুর্নিবার গতিতে ছুটে চলা তাকে টেনে টেনে ধরে এখনো। তার স্বগতোক্তিতে “হন্ট” করে।

বেশ উপভোগ্য এই আলাপচারিতা গম ক্ষেত থেকে এসে পড়ল কাদায়। তার পোষাক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে নেতিবাচক এবং আক্রমণাত্মক মন্তব্যের প্রসঙ্গ এলে- অকপটে তিনি জীবনানন্দের কবিতা মনে করালেন:

“আমাদের হৃদয়ের নদীর উপর দিয়ে ধীরে
এখনো যেতেছে চ’লে কয়েকটি শাদা রাজহাঁস।”

বললেন, “জীবন রাজহাঁসের মতো হওয়া উচিত। রাজহাঁস থাকে কাদায় কিন্তু সে জল থেকে উঠে ঝাপটা দিয়ে ফেলে দেয় সব ময়লা মাটি।”

তিলোত্তমা কলকাতা বা ইন্দ্রজাল বিছানো বলিউড-পুরী বোম্বে। অতঃপর ইরানি চলচ্চিত্র। একলা অসম্ভব প্রত্যয়ী জয়া জানেন পরিযাজনই জীবন। বিলকিস, দেবী, কুসুম আর নয়নার অভিযোজনের মাঝে মাঝে, বিনোদনের রূপালি দুনিয়া থেকে জয়াকে আকস্মিকভাবে টেনে আনে সেনাদের মতো সংঘবদ্ধ থাকা গম ক্ষেত চিড়ে যাওয়া রংপুরের দুরন্ত দ্রুতির রেলগাড়ি!