‘দক্ষিণী ছবির দাপটে’ পশ্চিমবঙ্গে হল পাচ্ছে না বাংলা সিনেমা

পশ্চিমবঙ্গে রমরমিয়ে চলছে “পুষ্পা টু”। এর মধ্যে বড়দিন উপলক্ষে চারটি বাংলা সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, অনেক পরিবেশক এবং প্রদর্শকদের কাছে বাংলা সিনেমার চেয়ে দক্ষিণী সিনেমা প্রাধান্য পাচ্ছে। হল পাচ্ছে না বাংলা সিনেমা।

ভারতজুড়ে বক্স অফিসে সাড়া জাগিয়েছে দক্ষিণের সিনেমা “পুষ্পা টু”। এই সিনেমার হিন্দি ভার্সন পশ্চিমবঙ্গের নানান শহর থেকে জেলার বিভিন্ন হলে চলছে। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে মাল্টিপ্লেক্স, সর্বত্রই শো হাউসফুল। এর মধ্যে বাংলা সিনেমার মুক্তির দিন এগিয়ে আসায় তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

বাংলা সিনেমার মুক্তি

সামনেই বড়দিন ও নতুন বছর। এই উপলক্ষে অন্তত চারটি সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা। দীপক অধিকারী ওরফে দেবের “খাদান”, রাজ চক্রবর্তীর “সন্তান”, প্রতীম ডি গুপ্তর “চালচিত্র” ও মানসী সিংহের “৫ নম্বর স্বপ্নময় লেন”। এই চারটি সিনেমাকে জায়গা করে দিতে হবে বিভিন্ন হলে। কিন্তু মুক্তির দিন এগিয়ে এলেও বুকিং পাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছে চারটি বাংলা সিনেমা।

এই সিনেমাগুলোর মধ্যে “সন্তান” ও “খাদান”-এর নেপথ্যে রয়েছে বড় প্রযোজনা সংস্থা। “সন্তানের” ক্ষেত্রে এসভিএফ এবং “খাদানের” ক্ষেত্রে সুরিন্দর ফিল্মস ও দেব। এই দুটি সিনেমাও হলে জায়গা পেতে বেগ পাচ্ছে। সেই কারণে ক্ষোভ গোপন রাখেননি দেব ও রাজ চক্রবর্তী ।

ফেসবুক পোস্টে দেব লিখেছেন, “খাদানের বুকিং শুরু হয়নি বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করছি। এর জন্য দায়ী ভিন্ন ভাষার সিনেমা।”

রাজ চক্রবর্তীর বক্তব্য, “আমাদের রাজ্যে বাংলার আগে হিন্দিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমি শুধু সন্তানের কথা বলছি না। সব বাংলা সিনেমাকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু সেটা করা হয় না।”

মুক্তি পেতে চলা বাকি দুটি বাংলা সিনেমা কম বাজেটের। ফলে “৫ নম্বর স্বপ্নময় লেন” এবং “চালচিত্র” আরও সমস্যার মধ্যে রয়েছে। রাজ্যের শাসক দলের দুই জনপ্রতিনিধি হয়েও দেব ও রাজের খেদ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, ছোটখাটো প্রযোজনা সংস্থার সিনেমার হল পাওয়া কতটা কঠিন। এমনকি “সন্তান” সিনেমাটিও মাল্টিপ্লেক্স বুকিং পেলেও কোনো সিঙ্গেল স্ক্রিন এখনও পায়নি।

দক্ষিণী সিনেমার দাপট

এই অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেখা গেছে, হিন্দি সিনেমার জন্য বাংলা সিনেমা জায়গা পাচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে বিশুদ্ধ ব্যবসায়িক কারণ। মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিনের কর্ণধারদের বিপুল টাকার ব্যবসা দিচ্ছে “পুষ্পা টু”।

সূত্রের খবর, দক্ষিণী সিনেমাটি প্রথম সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২০ কোটির বেশি টাকার ব্যবসা করেছে। এই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেই ছুটির আমেজ চলে আসবে। তখন হিন্দি সিনেমা দেখতে ভিড় আরও বাড়বে। ফলে বড়দিন ও নতুন বছরের সপ্তাহে বাংলা সিনেমার জন্য কোনো সুখবর থাকছে না, এই অনুমান করা যায়। সমস্যার সমাধান খুঁজতে বৃহস্পতিবার প্রযোজকদের সঙ্গে মাল্টিপ্লেক্স ও হল মালিকদের দফায় দফায় বৈঠক হয়।

সূত্রের খবর, উভয় পক্ষের মধ্যে যথেষ্ট চাপান-উতোর হয়েছে। কেন বাংলা সিনেমা পশ্চিমবঙ্গেই প্রদর্শনের সুযোগ থাকবে না, এই প্রশ্ন তুলেছেন প্রযোজকরা। পাল্টা আর্থিক কারণ সামনে এনেছেন হল মালিকরা।

তাদের বক্তব্য অবশ্য আলাদা। মাল্টিপ্লেক্স কর্তাদের দাবি “পুষ্পা টু”-এর পাশাপাশি আইনক্স, পিভিআর-এর মতো প্রথম সারির মাল্টিপ্লেক্সে দেখানো হবে “সন্তান” ও “খাদান”। যদিও “চালচিত্র” এবং “৫ নম্বর স্বপ্নময় লেনের” ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়।

রাজ্য সরকার ২০১৮ সালে চলচ্চিত্র আইন সংশোধন করে। এই সংক্রান্ত নির্দেশিকায় বলা হয়, জিটিএ এলাকা ছাড়া সব সিঙ্গেল স্ক্রিন এবং মাল্টিপ্লেক্সে প্রাইম টাইমে, অর্থাৎ দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে বছরে অন্তত ১২০ দিন ন্যূনতম একটি শো-এ বাংলা সিনেমা দেখানো বাধ্যতামূলক। সেই নির্দেশিকা বাস্তবায়িত হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

কলকাতার অন্যতম মাল্টিপ্লেক্স পিভিআর আইনক্স-এর ইউনিট হেড কুন্তল ঘোষ বলেন, “মাল্টিপ্লেক্সের ব্যবসা সিনেমার কনটেন্টের ওপর হয়। আঞ্চলিক সিনেমা আসবে, আমাদের শো দিতে তো হবেই। আমরা আঞ্চলিক সিনেমার বুকিং আগে ওপেন করিয়ে দিচ্ছি। এখন পর্যন্ত আমরা পুষ্পা টু বুকিং ওপেন করিনি। খাদান, সন্তান রিলিজ করছে। অনেকগুলো করে শো চালাচ্ছি। সরকার থেকে নিয়ম করে দিয়েছে নির্দিষ্ট সংখ্যক আঞ্চলিক সিনেমা দেখানোর। পূজার সময় আমরা বাংলা সিনেমাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছি।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক মানস ঘোষ বলেন, “সরকার একটা আইন করতে পারে। কিন্তু সরকারের পক্ষে এটা কার্যকর করা মুশকিল, যতদিন না এখানে সঠিক নিয়মনীতি মেনে কাজ হচ্ছে। বাংলা সিনেমা রিলিজের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, যারা ছোট পরিবেশক বা স্বাধীন পরিচালক (যেমন প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী), নির্দিষ্ট দুটো-তিনটে গোষ্ঠীর সঙ্গে যারা যুক্ত নন, তারাও হল পান না। এর একটা বড় কারণ হল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের এক ধরনের রাজনীতি এবং ওই গোষ্ঠীরগুলোর একাধিপত্য। এরা নিজেরাই বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে। তারপর যখন অন্য সিনেমা এসে হল পেয়ে যায় বা হিট হয়ে যায়, তখন এরা কাঁদুনি গাইতে শুরু করে যে বাংলা সিনেমাকে বাঁচানোর জন্য সরকার কিছু করছে না।”

তাহলে কি বাংলা সিনেমার গুণমান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? অতীতে “পাঠান” বা “আরআরআর” সিনেমার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে বাংলা সিনেমা হল পায়নি।

অধ্যাপক বলেন, “বাংলা সিনেমার একমাত্র দর্শক হচ্ছে শহুরে মধ্যবিত্ত, নব্যধনী সম্প্রদায়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার রিভিউতে বাংলা সিনেমাগুলোর যে প্রশংসা করা হয়, তা অন্তঃসারশূন্য। এই সিনেমাগুলো ওই উক্ত দুটি-তিনটি গোষ্ঠী দ্বারাই তৈরি করা হয়। ফলে তারা নিজেরাই বাংলা সিনেমাকে কোনো না কোনোভাবে সীমাবদ্ধ করেছে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে। বাংলা সিনেমা যে নিজে স্বনির্ভর হতে পারছে না, তার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, গোষ্ঠীগুলির হাতে পুরো ক্ষমতাটা কেন্দ্রীভূত হওয়া। তার ওপর বাংলা সিনেমাতে আর বিনিয়োগও নেই। বাজার কীভাবে বাড়াতে হবে, সেই স্ট্র্যাটেজি ভাবতে হবে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে। যেটা তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ভাবতে পেরেছে।”

চলচ্চিত্র পরিচালক অশোক বিশ্বনাথ বলেন, “বাংলা সিনেমা এমনিতেই নানা কারণে কোণঠাসা। স্বল্পসংখ্যায় বাংলা সিনেমা যদি না মুক্তি পেতে পারে, তাহলে প্রযোজকরা কেন টাকা লাগাবেন, এই শিল্প মৃত হয়ে যাবে।”

তিনি মনে করেন, “হিন্দি সিনেমা বা প্যান ইন্ডিয়ান সিনেমা (যেমন, পুষ্পা বা আরআরআর) আপাতভাবে অনেকটা চাকচিক্যপূর্ণ। সব সময় অর্থ দিয়েই ভালো সিনেমা তৈরি হয় না। অভিনব বিষয় এবং আঙ্গিক দিয়ে যদি স্বল্প অর্থে আমরা ভাল বাংলা সিনেমাতে করতে পারি, তাহলেই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র দেখে বাংলা সিনেমার মানটাকে আর উন্নত করতে হবে।”

বাংলা সিনেমার নিজস্ব টানাপোড়েন

অনেকে মনে করছেন, উৎসবের মৌসমে একসঙ্গে এতগুলো সিনেমা নিয়ে এলে ব্যবসায়িক সমস্যা হওয়া খুব স্বাভাবিক। হিন্দি বা দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একই কারনে একসঙ্গে দুটোর বেশি সিনেমামুক্তির পথে হাঁটে না।

কুন্তল ঘোষ বলেন, “এটা মূলত সিঙ্গেল স্ক্রিনের সমস্যা। পুষ্পা টু-র সময় প্রায় চার ঘন্টা। দিনে ৩টা শো চালালেই সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পুষ্পা টু যখন রিলিজ করেছে, তখন কোনো সিনেমা রিলিজ করেনি। বাংলা সিনেমার প্রডিউসার, ডিস্ট্রিবিউটাররা এই সমস্যা চিহ্নিত করতে পারবেন। একইসঙ্গে চারটি সিনেমা রিলিজ করার দরকার ছিল না। ওদের নিজেদের মধ্যেই এই সংঘর্ষ লাগছে। পুষ্পা টু-কে আমি বাদ দিয়ে যদি বলি দর্শক চারটি বাংলা সিনেমার মধ্যে একটাকে বেছে নেবেন। দর্শক তো এখানেই বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে।”

কলকাতার পুরোনো সিনেমা হলগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো “প্রিয়া”। এই প্রেক্ষাগৃহের কর্ণধার ও প্রযোজক অরিজিৎ দত্ত বলেন, “যে সিনেমা চলছে, সেই সিনেমা নামানো যায় না। গত দু সপ্তাহ পুষ্পা টু সমস্ত হলে চলেছে, ব্যবসা দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। চারটি বাংলা সিনেমা একসঙ্গে আসার দরকার কি ছিল? ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসতে পারতো, দুটো আসতে পারতো এখন, বাকি দুটো পরে আসতো। তাতে কোনো সমস্যা ছিল না। সব সময় বাইরের সিনেমাকে দোষ দেওয়া হয় কেন?”

অশোক বিশ্বনাথন বলেন, “অবশ্যই পরিবেশক এবং প্রদর্শককে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে স্বল্প সংখ্যক বাণিজ্যিক কিংবা তথাকথিত শিল্প-সম্মত বাংলা সিনেমা দেখানোর কিছুটা জায়গা দিতেই হবে। এটাকে সমর্থন বা সংরক্ষণ যাই বলুন না কেন, সম্মিলিতভাবে এটা করতে হবে। তাহলে এই বাংলা সিনেমা বাঁচতে পারে।”

শুধু দক্ষিণী সিনেমার কারণে বাংলা সিনেমা ব্যবসা পায় না এমনটা ঠিক নয়। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন বাংলা সিনেমাকে অনেকটা পিছিয়ে দিচ্ছে।

মানস ঘোষের বক্তব্য, “সিনেমা তৈরি আর রিলিজ করা আলাদা বিষয়। সেখান থেকে রেভিনিউ অর্জন করাটাও। এই বাণিজ্যিক জায়গায় আজকের গ্লোবালাইজেশনের বাজারে প্রত্যেককেই প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকতে হয়। দুই-তিনটি গোষ্ঠীর পরিবেশক, প্রযোজকরা খোলা বাজারের ওপেন প্র্যাক্টিসকে নিজেদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেন না। তারা নিজেরাই ৪০% বাংলা সিনেমাকে পেছনে ঠেলে দেন। এরপর দক্ষিণের সিনেমা বাজার দখল করে নিলে এরা কান্নাকাটি করে। সঠিক নিয়মনীতি মেনে চললে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই সেটা করা উচিত। বাংলা সিনেমার সার্বিক উন্নতি যদি সম্ভব হয়, তাহলে আর এই কথাগুলো উঠবে না।”

তাহলে বাংলা সিনেমা দর্শক টানতে পারছে না? সেজন্যই কি রমরমিয়ে নিয়ে চলছে পুষ্পা টু এর মতো সিনেমা? অরিজিৎ দত্ত বলেন, “বাইরের সিনেমাগুলো ৫০ সপ্তাহের ব্যবসা দিচ্ছে। বাংলা সিনেমা চার-পাঁচটা করে আসছে পুজো, বড়দিন, পয়লা বৈশাখে। কী করে সব সিনেমাকে জায়গা দেওয়া যাবে? আমরা কি দুই সপ্তাহ নিয়ে ভাবব? আমাদের বছরের বাকি সপ্তাহ নিয়েও ভাবতে হবে। আমাদের তো বাইরের সিনেমা বাঁচাচ্ছে। তখন তো বাংলা সিনেমা একটাও নেই।”