ঢাকা: মেলাঙ্কলির সন্ধানে…

মাগরিবের আজান শেষ হলো।

ঠিক এই সময়টাতে ঢাকা শহরের বুকে এক অদ্ভুত হাওয়া বয়! বিকেল ফুরিয়েছে আবার রাতটাও ঠিক এসে পৌঁছায়নি এখনও!

আকাশের নীল ধীরে ধীরে ধূসর হতে হতে লালচে থেকে কালচে হয়ে আসে। রাস্তায় লাল লাল ব্রেকলাইটের সারি দীর্ঘ হয়, অফিসফেরতা মানুষের ভিড় বাড়ে বাড়ে। ফুটপাতের চায়ের দোকানে ভিড় জমে। কোথাও গরম তেল, কোথাও ভেজা ধুলোর গন্ধ, কোথাও গন্ধমের নিষিদ্ধ টান, কোথাও দিনের শেষ দীর্ঘশ্বাস!

তারপর হঠাৎ...এই শহরে কোথা থেকে যেন এক অনির্বচনীয় বিষণ্নতা নেমে আসে, সকাশে। কীভাবে আসে, কেউ তার খোঁজ জানে না! শুধু, এ শহরে সন্ধ্যে নামার পর মানুষের ভেতরের শব্দগুলো কণ্ঠ পায়, জ্যান্ত হয়ে ওঠে!

ঢাকা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহরগুলোর একটি; হয়তো সবচেয়ে নিঃসঙ্গও।

এ শহর মানুষকে চরিত্রের দোষে শুধু ক্লান্ত করে না, নাগরিককে ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়।

ঢাকা তো শুধু আর একটা শহর না; ঢাকা এক অন্তহীন প্রতিযোগিতা। ঘুম থেকে ওঠা থেকে চোখ বন্ধ করা পর্যন্ত মানুষ এখানে লড়াই করে। সময়ের সঙ্গে, টিকে থাকার, ভবিষ্যতের সঙ্গে; নিজের সঙ্গেও।

এই তো আমার ঢাকার মেলাঙ্কলি! আমার অনন্তহীন বিষাদের রোজনামচা!

কিন্তু কারণটা কি? এই শহরের বেশিরভাগ মানুষ এই শহরের নিজের কেউ না, তারা সফলতার সন্ধানে আসে, কেউ হয়তো স্বার্থকতারও! ষোল, সতেরো, আঠারোতে কেউ পড়তে আসে, কেউ চাকরির খোঁজে, কেউ স্বপ্ন নিয়ে। কেউ বা শুধু বাঁচতে!

তারপর? তারপর সবার কেটে গেছে আরও দশ, পনেরো, কুড়ি, তিরিশটা বছর, একটা পুরো জীবন!

জীবনের অর্ধেক কোথাও, অর্ধেকটা এই শহরে! তারপর একদিন মানুষ আবিষ্কার করে—সে আর পুরোপুরি কোথাও নেই...কোনোদিন গ্রামে ফিরলে পুরোনো রাস্তা আছে, চেনা মানুষগুলো আছে, গাছ আছে, আছে শৈশব, তবুও কোথাও যেন কিছু একটা নেই। একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। ফেলে আসা ঘরে আমাদের কোনোদিন আর ফেরা হয় না।

আবার ঢাকায় ফিরলেও মনে হয় না—এই শহর পুরোপুরি নিজের। সম্ভবত বড় শহরগুলোর এটাই সবচেয়ে নীরব ট্র্যাজেডি। শহর মানুষকে তো আশ্রয় দেয়, কিন্তু ঘরটা দেয় কী?

দিনের ব্যস্ততা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। ব্যস্ততার একটা দয়া আছে।

ব্যস্ত থাকলে মানুষ নিজের ভেতরের শব্দ কম শোনে। কিন্তু সন্ধ্যার পর শহরের গতি যখন একটু কমে আসে, তখন মানুষ নিজের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়-ই!

সম্ভবত, ঢাকার সন্ধ্যাগুলো সবচেয়ে বেশি আঘাত করে মধ্যবিত্ত মানুষদের। বিশেষত সেই বোহেমিয়ান মানুষেরা, যারা দুনিয়া জয় করবে বলে ঘর ছেড়েছিলো! তাদের জেতা হয়নি কিছুই, না হয়েছে ঘরে ফেরা!

যারা হয়তো একসময় ভেবেছিল—জীবনটা অন্যরকম হবে। আরও ভ্রমণ হবে।আরও গল্প হবে। হয়তো পৃথিবীটাকে একটু ধীরে দেখা হবে।

তারপর জীবন ধীরে ধীরে হিসেব শিখিয়ে দেয়। চাকরি, মিটিং, ডেডলাইন, বাড়ি ভাড়া, বেতন, মাস শেষ!

একদিন মানুষ আবিষ্কার করে—সেই আগের মানুষটা আর নেই। হয়তো এখনও সেই মানুষটা আছে। কিন্তু এখন সে ট্রাফিকের মধ্যে বসে থাকে। গুগল ক্যালেন্ডার আর অ্যালার্মে সময় মাপে, রাতে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

এই শহরের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত যানজট না। এই শহরে মানুষ বেঁচে থাকার প্রস্তুতি নিতে নিতে বেঁচে থাকাটাই ভুলে যায়।

এখানে স্বপ্ন আছে। কিন্তু স্বপ্নের ভেতর বিশ্রাম নেই। ফাঁকা দুপুর নেই। আছে শুধু ছুটে চলা। আরও একটু ভালো ভবিষ্যৎ। আরও একটু পরে বাঁচার পরিকল্পনা।

এই শহরে আসলে বর্তমান নেই! নাগরিক থাকে আগামী মাসে। পরের মাসের বেতনে। সামনের জীবনে।

সম্ভবত এই কারণে এই শহরের গানগুলোতেও এতো বিষণ্নতা জমে আছে। অঞ্জন দত্তের মালা’র কথা মনে পড়ে—“দুজনেরই চোখে ছিল বাঁচার স্বপ্ন…” কারা এই দুজন? প্রেমিক-প্রেমিকা? নাকি এটাই নগর আর নাগরিকের গল্প? দুজনেই একে অপরের কাছে কিছু খুঁজতে এসেছিল! একজন আশ্রয়। অন্যজন মানুষ। তারপর ধীরে ধীরে দুজনেই বদলে গেল।

তবুও তো মানুষ এই শহর ছাড়ে না। অথবা ছাড়তে পারে না। সম্ভবত, কিছু কিছু শহর ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরাত্মায় ঢুকে যায়, আর ছাড়ে না। পুষে রাখা জ্বরের মতো। পুরোপুরি ভালোও হয় না। পুরোপুরি ছাড়েও না।

এই শহরের সন্ধ্যাগুলোতে নাজিম হিকমত চিরকাল প্রাসঙ্গিক না? —“আমার সঙ্গে কবরে যাবে এক অসমাপ্ত গানের বেদনা…” কিছু বেদনা আসলে শেষ হয় না। মানুষ শুধু সেগুলো নিয়ে বাঁচতে শিখে।

এক বন পলাশ ফুটলো না বলে মানুষটা ভেতর ভেতরে যে মরে গেল—সে কোনোদিন এই নগর ছেড়ে গেলো না!

যেতে পারলো না। অথচ সে কোনোদিন পুরোপুরি শহরেরও হলো না। নগরও কোনোদিন তার হলো না।

তারপর সন্ধ্যা নামে। মাগরিবের পর ঢাকায় আবার সেই অদ্ভুত সময় শুরু হয়। শহরে আবার লাইন ধরে আলো জ্বলে। মানুষ নিয়মমাফিক বাড়ি ফেরে।

এই শহর জেনেও যেন জানে না নাগরিক বেদনার ক্ষত।

একটি পলাশ ফুটলো না বলে তার বহুদিনের চেপে রাখা কান্না গলা আর বুকের ভেতরেই কোথাও দলা পাকিয়ে রয়ে গেলো; আর কোনোদিন চোখের নাগাল পেলো না।

কেউ জানলো না। হয়তো পাশে শুয়ে থাকা অর্ধশতাব্দীর সঙ্গীটাও না। নিজেকেও বলা হলো না কখনও।

অমনি আরেকটা মাগরিবের আজান—কোনো এক জানালার পাশে, কোনো এক নাগরিকের অন্দরে, এখনও হয়তো চুপচাপ একটা পলাশ ফোটার অপেক্ষা!

তারপর... তারপর মানুষটা আরও একটু একা হয়ে যায়।

এই শহরটাও…