Saturday, September 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাকরখানির নেপথ্যের এক করুণ প্রেমকাহিনি, যা বেশিরভাগ মানুষ জানে না

পুরান ঢাকার অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম একটি জনপ্রিয় নাম ‘বাকরখানি’

আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম

পুরান ঢাকার অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম একটি জনপ্রিয় নাম ‘বাকরখানি’। সকাল কিংবা বিকেলের নাশতায় চায়ের সঙ্গে মুচমুচে ও সুস্বাদু এই খাবারের জুড়ি মেলা ভার। তবে ভোজনরসিকদের কাছে এটি কেবল একটি মুখরোচক খাবারই নয়, এর নামের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাস ও এক ট্রাজিক ভালোবাসার উপাখ্যান।

জনশ্রুতি রয়েছে, মুঘল আমলে ঢাকায় এই খাবারের চল শুরু হয়। নাজির হোসেনের লেখা ‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ বইসহ ইতিহাসনির্ভর বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর দত্তকপুত্র আগা বাকের খাঁ এবং সে সময়ের বিখ্যাত নর্তকী খনি বেগমের নামানুসারেই এই খাবারের নামকরণ হয়েছিল ‘বাকরখানি’।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুবাদার শাসনের সময় তুরস্কের অধিবাসী তরুণ আগা বাকের ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতবর্ষে আসেন এবং নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। নিজের বীরত্ব ও যোগ্যতাবলে তিনি দ্রুত সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন হন। নবাবের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি বাকেরকে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এই তরুণ আগা বাকের তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী খনি বেগমের প্রেমে পড়েন।

তাদের এই প্রেমকাহিনি শুরুর দিকে মধুর হলেও এর শেষটা ছিল অত্যন্ত বিরহ ও বেদনার। উজিরে আলা জাহান্দর খাঁর পুত্র জয়নুল খাঁও খনি বেগমের প্রতি আসক্ত ছিলেন। খনি বেগমকে কেন্দ্র করে বাকেরের সাথে জয়নুলের বিরোধ তৈরি হলে একপর্যায়ে জয়নুল খাঁ পালিয়ে যান। তবে তিনি রটিয়ে দেন যে, বাকের তাকে হত্যা করে লাশ গুম করেছেন। এই মিথ্যা সংবাদের ভিত্তিতে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ নিজের পালক পুত্র বাকেরকে শাস্তি হিসেবে ক্ষুধার্ত বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করেন।

বাকের যখন খাঁচায় বন্দি, সেই সুযোগে জয়নুল খাঁ খনি বেগমকে অপহরণ করে ভাটি বাংলার গহীন অরণ্যে নিয়ে যান। পরবর্তীতে তাকে বর্তমান বরিশালের চন্দ্রদ্বীপে আটকে রাখা হয়। এদিকে বীর বাকের খাঁচায় বন্দি অবস্থায় নিজের সাহসিকতায় হিংস্র বাঘটিকে হত্যা করে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন। খনি বেগমের অপহরণের খবর পেয়ে তিনি সেনাপতি কালা গাজীকে নিয়ে চন্দ্রদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

উজির জাহান্দর খাঁও ছেলের এই অপকর্মের কথা জানতে পেরে তাকে শাস্তি দিতে সেখানে পৌঁছান। বাবার তরবারির আঘাতেই জয়নুল খাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হয়, তবে মরার আগে জয়নুল প্রতিশোধবশত পাশে থাকা খনি বেগমের বুকে ছুরি বসিয়ে দেন। ফলে ঘটনাস্থলেই খনি বেগমের করুণ মৃত্যু হয়।

প্রিয়তমা খনি বেগমের এই নৃশংস মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি বাকের। শোকে পাগলপ্রায় বাকেরকে সান্ত্বনা দেন নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ। পরবর্তীতে খনি বেগমের স্মৃতি এবং তাদের অসম্পূর্ণ প্রেমকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখতে বাকের খাঁ এক বিশেষ ধরনের শুকনো রুটি প্রস্তুত করেন। গোলাকার এই রুটির মাঝখানে চারটি দাগ টেনে তিনটি লম্ব স্তম্ভ তৈরি করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘বাকের-খনি’। এই ‘বাকের-খনি’ শব্দবন্ধটিই কালক্রমে মানুষের মুখে মুখে রূপ নেয় আজকের ঐতিহ্যবাহী ‘বাকরখানি’তে।

নবাবের এই দত্তকপুত্র পরবর্তীতে উমেদপুরের জমিদারি লাভ করেন এবং সেলিমাবাদ ও চন্দ্রদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেন। তার নামানুসারেই ১৭৯৭ সালে ইংরেজ শাসনামলে বর্তমান বরিশাল অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছিল ‘বাকেরগঞ্জ’। পরে পিতা মুর্শিদকুলী খাঁর ইচ্ছায় বাকের খাঁ পুনরায় বিয়ে করে সংসারী হলেও, পুরান ঢাকার বাকরখানির প্রতিটি কামড়ে আজও জড়িয়ে রয়েছে খনি বেগমের প্রতি তার সেই অমর ভালোবাসার ইতিহাস।

   

About

Popular Links

x