লিপস্টিক আমাদের দৈনন্দিন সাজের এমন একটি অংশ, যা ছাড়া অনেকেরই দিন চলে না। এক নিমেষেই চেহারায় সতেজতা আনতে এর জুড়ি মেলা ভার। তবে, প্রতিদিনের এই সৌন্দর্যের পেছনের কিছু লুকানো ক্ষতিকর দিকও রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বহুল প্রচলিত বেশ কিছু ব্র্যান্ডের লিপস্টিক ও লিপগ্লসে সীসা ছাড়াও ক্যাডমিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, ক্রোমিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ সহ প্রায় ৯টি ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকদের মতে, দিনে কয়েকবার লিপস্টিক ব্যবহারের ফলে শরীরে যে পরিমাণ ক্রোমিয়াম প্রবেশ করে, তা দীর্ঘমেয়াদে পেটের টিউমার বা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া ম্যাঙ্গানিজের আধিক্য স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
ভারী ধাতুর উপস্থিতি
অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের লিপস্টিক পরীক্ষা করেও সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সীসা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে এবং এটি শরীরে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। লিপস্টিককে উজ্জ্বল করতে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম ধাতুগুলো কিডনি ও যকৃতের (লিভার) জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
রাসায়নিক উপাদান
লিপস্টিক দীর্ঘদিন ফাঙ্গাস বা ব্যাকটেরিয়ামুক্ত রাখতে প্যারাবেন ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং এর সাথে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির কিছুটা যোগসূত্র থাকতে পারে। থ্যালেটস নামক উপাদান ব্যবহার করা হয় যা শরীরের হরমোন সিস্টেমে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। ভারী ধাতু ছাড়াও লিপস্টিকে ব্যবহৃত খনিজ তেল নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, লিপস্টিকে ব্যবহৃত নিম্নমানের খনিজ তেল থেকে মোশ (MOSH - Mineral Oil Saturated Hydrocarbons) এবং মোয়াহ (MOAH - Mineral Oil Aromatic Hydrocarbons) নামক রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই উপাদানগুলো সহজে শরীর থেকে বের হতে পারে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে লিভার ও লিম্ফ নোডে জমা হয়ে অভ্যন্তরীণ জটিলতা তৈরি করে।
পেটে যাওয়ার ঝুঁকি
ঠোঁটে লাগানো লিপস্টিক কথা বলা, খাওয়া বা পানি পানের সময় অজান্তেই আমাদের পেটে চলে যায়। সারাজীবনে একজন নিয়মিত লিপস্টিক ব্যবহারকারী নারী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাসায়নিক শুধু গিলে ফেলার মাধ্যমেই শরীরে গ্রহণ করেন, যা পেটের নানা সমস্যা ও বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।
ঠোঁটের শুষ্কতা এবং অ্যালার্জি
বিশেষ করে ম্যাট এবং লং-লাস্টিং লিপস্টিকগুলোতে এমন কিছু কেমিক্যাল থাকে যা ঠোঁটের স্বাভাবিক তেল ও আর্দ্রতা শুষে নেয়। এর ফলে ঠোঁট ফাটা, চামড়া ওঠা, ঠোঁট কালচে হয়ে যাওয়া এবং নানা ধরনের অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন দেখা দিতে পারে।
কী দেখলে সতর্ক হবেন?
ঠোঁটে অস্বাভাবিক কোনো মাংসপিণ্ড থাকলে, ফাটা ঠোঁট হাজার ক্রিম বা বামেও যদি ঠিক না হয়, সেক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া হঠাৎ যদি ঠোঁটের রং বদলাতে শুরু করে, আবার শীতের সময়ে ঠোঁটের কোণে যে ফাটল ধরেছিল তা গরমকালেও শুকোয়নি, তখন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে করণীয়
লিপস্টিক ব্যবহার করা একেবারেই ছেড়ে দিতে হবে - এমনটা নয়। তবে একটু সচেতন হলে এই ক্ষতিগুলো সহজেই এড়ানো যায়:
উপাদান চেক করুন: কেনার আগে লেবেল পড়ে নিশ্চিত হোন যে পণ্যটি প্যারাবেন-ফ্রি, লেড-ফ্রি এবং ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্ত।
লিপবাম ব্যবহার: সরাসরি ঠোঁটে লিপস্টিক না লাগিয়ে, প্রথমে ভালো মানের একটি লিপবাম বা পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে নিন। এটি ঠোঁট ও লিপস্টিকের মাঝে একটি সুরক্ষা স্তর তৈরি করবে।
অর্গানিক ব্র্যান্ড বেছে নেওয়া: সম্ভব হলে ভেগান বা প্রাকৃতিক উপাদান (যেমন: শিয়া বাটার, জোজোবা অয়েল, ন্যাচারাল কালার) দিয়ে তৈরি লিপস্টিক ব্যবহার করুন।
সঠিকভাবে পরিষ্কার করা: দিনশেষে বা ঘুমানোর আগে অবশ্যই মেকআপ রিমুভার, মাইসেলার ওয়াটার বা নারকেল তেল দিয়ে লিপস্টিক পুরোপুরি তুলে ফেলতে হবে।
ব্যবহার সীমিত করা: প্রতিদিন ভারী মেকআপ বা ম্যাট লিপস্টিক ব্যবহার না করে, মাঝে মাঝে ঠোঁটকে বিশ্রাম দিন।
সচেতনতা এবং সঠিক পণ্য বাছাই করার মাধ্যমেই আপনি নিজের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য - দুটোই ধরে রাখতে পারেন।