শৈশবের ভিটেমাটি, যেখানে শেকড় পোঁতা আমাদের, সেগুলো কিন্তু সব সময় আমাদের ঘর ছিলো না! ছিলো বন্ধুর বাড়ি। পাড়ার বড় ভাইয়ের ঘর, যেখানে দেয়ালের পাশে ক্যাসেটের বাক্স, টেবিলে অর্ধেক পড়া বই, বিছানার ওপর অগোছালো এক তরুণ জীবন। বন্ধুর বড় বোনের বুকশেলফ, যেখানে বইয়ের মলাটে হাত বোলালে মনে হতো, বইও মানুষের মতো বেঁচে থাকে—পাতার পাশে পেন্সিলের দাগ, ভাঁজের মধ্যে শুকনো ফুল, কোথাও কোনো পুরোনো চিঠির ছেঁড়া অংশ। কারও চাচার ড্রয়িংরুম, যেখানে সন্ধ্যা নামলে পর্দা টানা- টেলিভিশনের নীল আলোয় মুখগুলো অর্ধেক দেখা যেত, আর ছোটরা চুপ করে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতো। কারও খালার রান্নাঘরের গন্ধ, কারও মামার পুরোনো রেকর্ড, কারও দাদা-দাদির বিকেলের ধীর বিষণ্নতা—এসবও আমাদের বড় হওয়ার অংশ ছিল।
আমরা শুধু নিজেদের মা-বাবার ঘরে বড় হইনি। আমরা বড় হয়েছি অন্য মানুষের জীবনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে। সেসব ঘরে ঢুকতে আমাদের কোনোদিন অনুমতির প্রয়োজন হয়নি। আমাদের নিজেদের ঘর ছিলো কিছুটা দূরে অন্য পাড়া; তবু বিকেল নামলে ওইসব ঘরের কার্নিশে এসে বসা যেন আমাদের আজন্মের অধিকার।
তখন অ্যালগরিদম আমাদের রুচিবোধের জন্ম দিত না, সংক্রমিত হতো মানুষের মধ্যে দিয়ে। এলাকার বড় ভাই হয়তো কোনো একদিন নচিকেতার ক্যাসেট চালিয়ে দিয়েছিলেন। কোথাও অঞ্জন দত্ত, কোথাও কবীর সুমন, কোথাও জেমস কিংবা আইয়ুব বাচ্চুর গান। আমরা হয়তো তখন গানের কথা বুঝতাম না, কিন্তু বুঝতাম—মানুষের ভেতরে এমন কিছু ঘর আছে, যেখানে আলো কম, কথা কম, তবু সেখানে কেউ একজন বসে থাকে।
বড় বোনের বুকশেলফ থেকে নামানো কোনো বই, কাকার সঙ্গে দেখা কোনো পুরোনো সিনেমা, কিংবা বড়দের আড্ডায় হঠাৎ শোনা কোনো নাম—এসবের মধ্য দিয়েই আমরা পৃথিবীকে একটু বড় করে চিনতাম। সেই পৃথিবীতে প্রেম ছিল, পরাজয় ছিল, শহর ছিল, শহরতলী ছিল, অন্যায় ছিল, পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, আবার ফিরে না আসার চিনচিনে অভিমান ছিল।
এখন মনে হয়, ওইসব ঘর আসলে শুধু ঘর ছিল না। ওগুলো ছিল ছোট কিন্তু হৃদয় নিমার্ণের কুটির শিল্প। সেখানে কোনো পাঠ্যসূচি ছিল না, কোনো পরীক্ষা ছিল না, কেউ আমাদের মানুষ করার দায়িত্বও নেয়নি। তবু গান থেকে বিষণ্নতার ভাষা, বই থেকে অন্য জীবনের খবর, সিনেমা থেকে প্রেম ও পরাজয়ের মুখ, আর বড়দের নীরবতা থেকে সময়ের ভার চিনতে শিখেছিলাম।
আর সবচেয়ে বড় কথা, ওইসব ঘরে আমাদের জন্য একটুখানি জায়গা রাখা থাকত। কেউ হয়তো বিশেষ করে জিজ্ঞেস করত না, কেন এসেছি। বলা হতো, খেয়ে যেও। এই বইটা পড়েছ? এই গানটা শোনো। কিংবা কিছুই বলা হতো না; আমরা চুপচাপ বসে থাকতাম, তবু মনে হতো সেখানে থাকার অনুমতি আছে। নিজের কোনো ঘর না হয়েও, ওই ঘরগুলো আমাদের জন্য অচেনা ছিলো না।
এই স্মৃতিকে নস্টালজিয়া বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় এবং তার বিপদও আছে। পুরোনো বড় পরিবার সবসময় উষ্ণ ছিল না; সেখানে শাসন, অকারণ হস্তক্ষেপ, নারীর অদৃশ্য শ্রম ও ব্যক্তিগত গোপনতার অভাব ছিল। অনেকের কাছে আলাদা ঘর, নিজের আয়, নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের দরজা বন্ধ করার অধিকারই ছিল মুক্তি। তাই এটি যৌথ পরিবারে ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়। এটি শহুরে মধ্যবিত্তের, নব্বইয়ের শেষভাগ আর নতুন শতাব্দীর শুরুর এক বিশেষ স্মৃতির লেখা। অনেকের শৈশবের ঘর ছিল ভয়ের, অভাবের বা অপমানের জায়গা; সেই অভিজ্ঞতার ওপর কোনো রোমান্টিকতা চাপানো যায় না। তবু আধুনিক নাগরিক জীবনের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কী হারিয়েছি, সেই প্রশ্নটি তোলা দরকার।
বাংলাদেশের সর্বশেষ জনশুমারি বলছে, ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে গড় পরিবারের আকার ৪.৪ জন থেকে ৪.০ জনে নেমেছে। সংখ্যাটি খুব নাটকীয় নয়। কিন্তু এর মধ্যে বসবাসের ধরন বদলের একটি ইশারা আছে—ছোট হয়ে আসা ডাইনিং টেবিল, কমে আসা অতিরিক্ত চেয়ার, আলাদা হয়ে যাওয়া ঘর, আর ব্যক্তিগত জীবনের চারপাশে একটু একটু করে শক্ত হয়ে ওঠা দেয়াল।
এই সংখ্যা একাকিত্বের সরল প্রমাণ নয়। মানুষ ছোট পরিবারেও গভীরভাবে যুক্ত থাকতে পারে; বড় পরিবারেও ভীষণ একা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরিবার ছোট হওয়া, শহর বড় হওয়া, কাজের সময় দীর্ঘ হওয়া, ভাড়া ও যাতায়াতের চাপ, নিরাপত্তা ও গোপনতার প্রয়োজন—সব মিলিয়ে আমাদের ঘরগুলোর ব্যবহার বদলে গেছে।
নিজের ঘর এখন শুধু বিশ্রামের জায়গা নয়, টিকে থাকার একটি প্রকল্প। ঘর মানে ভাড়া, বিল, রান্না, ক্লান্তি, নিরাপত্তা, অনলাইন মিটিং, অসমাপ্ত কাজ, আর দিনের শেষে দরজা বন্ধ করে নিজের মতো থাকার অধিকার। এতে কোনো অপরাধ নেই। কেউ খারাপ হয়ে যায়নি। বড় ভাইয়ের নিজের সংসার হয়েছে, বড় বোন অন্য শহরে গেছেন, বন্ধুর বাড়ি এখন তার সন্তানের ঘুমের সময়ের হিসাব করে, চাচার ড্রয়িংরুমে একসঙ্গে সিনেমা দেখার বদলে আলাদা আলাদা স্ক্রিন জ্বলে। ব্যস্ততারও তো এক স্থাপত্য আছে। তার মধ্যে অনাহূত হয়ে ঢুকে পড়ার মতো দরজা কমে যায়।
এখন কারও বাসায় যেতে হলে আগে ফোন করতে হয়। হঠাৎ গিয়ে বসে থাকা প্রায় অভদ্রতা। আগে জানাতে হয়, সময় আছে কি-না, বাসায় কেউ থাকবে কি-না, বাচ্চার পরীক্ষা আছে কি-না, মানুষটি ক্লান্ত কি-না। আমাদের সম্পর্কগুলো ভেঙে যায়নি; বরং তারা আরও সুশৃঙ্খল হয়েছে। কিন্তু সেই শৃঙ্খলার ভেতরে কোথাও হারিয়ে গেছে অকারণ উপস্থিতির অধিকার।
এই শহরে মানুষের অভাব নেই। ফোনে শত শত নাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো সংযোগ, অফিসে সহকর্মী, আড্ডায় পরিচিত মুখ—সবই আছে। তবু মন খারাপ নিয়ে কোথাও গিয়ে চুপচাপ বসে থাকার জায়গা কম। কাউকে কারণ না জানিয়ে, কোনো পরিকল্পনা না করে, শুধু উপস্থিত থাকার অনুমতিটুকু ক্রমে বিরল হয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত এটাই আমাদের নাগরিক শূন্যতা।
ঘর আছে, কিন্তু ঘরের ভেতর অনির্ধারিত মানুষের জন্য জায়গা নেই। যোগাযোগ আছে, কিন্তু স্পর্শ নেই। কথাবার্তা আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই। আমরা একে অন্যের খবর রাখি, কিন্তু একে অন্যের জীবনের ভেতরে পুরোপুরি ঢুকতে দিই না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখছে না; এটিকে মানুষের সুস্থতা ও সমাজের টিকে থাকার প্রশ্ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আমাদের শৈশব হয়তো কথাটা আরও সহজ ভাষায় জানতো। মানুষকে ভালো রাখার জন্য সবসময় বড় কোনো আয়োজন লাগে না। কখনো কখনো শুধু কারও ঘরে একটি অতিরিক্ত চেয়ার থাকলেই হয়।
আজ আমার নিজের ঘর আছে। নিজের বিছানা আছে, নিজের আলমারি আছে, নিজের টেবিল, নিজের বই, নিজের জানালা। নিজের নামে ভাড়া দেওয়া একটি ঠিকানাও আছে। রোজ সকালে কাঁচা কাপড় পরে অফিসে দৌড়াই। মিটিং থাকে, ডেডলাইন থাকে, ইমেইলের উত্তর থাকে, শহরের জ্যামে আটকে থাকা এক দায়িত্বশীল মানুষের মুখ থাকে।
বাইরে থেকে আমাকে খুব নাগরিক লাগে। পরিপাটি, ব্যস্ত, প্রয়োজনীয়। যেন জীবনের সঙ্গে আমার একটি কার্যকর সমঝোতা হয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরে তো এখনো এক ব্যর্থ বৈরাগী বসত করে!
সে গান শুনে চুপ হয়ে যায়। পুরোনো বইয়ের গন্ধে থেমে দাঁড়ায়। কোনো সিনেমার অসমাপ্ত দৃশ্যে নিজের জীবনের একটি হারানো দরজা দেখতে পায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে ভাবে, মানুষ আসলে কোথায় বড় হয়? নিজের ঘরে, নাকি সেইসব “পর”-এর ঘরে, যেখানে তার নামে কোনো বিছানা ছিল না, তবু তাকে একটু জায়গা দেওয়া হতো!
আজ নিজের একলা ঘর আছে। দরজা আছে, কিন্তু দরজার ওপাশে আর এলাকার বড় ভাইয়ের ক্যাসেট বাজে না। বুকশেলফ আছে, কিন্তু বড় বোনের পেন্সিলের দাগ নেই। টেলিভিশন আছে, কিন্তু খালা-মামার ড্রয়িংরুমে একসঙ্গে সিনেমা দেখার সেই সমবেত অন্ধকার নেই। বারান্দা আছে, কিন্তু বিকেলের আলোয় বসে থাকা দাদা-দাদির দীর্ঘ, অলস, নরম বিষণ্নতা নেই।
তবু সব ঘর হারিয়ে যায় না। রাতে কখনো নচিকেতা বাজে, কখনো অঞ্জন, কখনো কবীর সুমন, কখনো জেমস, কখনো আইয়ুব বাচ্চু। বুকশেলফের কোনো পুরোনো বই খুললে মনে হয়, কোথা থেকে যেন ভেসে আসে বন্ধুর বড় ভাইয়ের ঘর, বড় বোনর বুকশেলফ, সিনেমা-দেখা সন্ধ্যা, কারও খালার রান্নাঘর, কারও দাদা-দাদির ধীর বিকেল।
স্মৃতি অবশ্য মানুষকে ফিরিয়ে আনে না। পুরোনো কোনো দরজা হঠাৎ খুলে যায় না। কিন্তু স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ হওয়ার জন্য কী কী দরকার ছিল।
শুধু নিজের বিছানা নয়। শুধু নিজের নামে ভাড়া দেওয়া ঠিকানা নয়। দরকার এমন কিছু দরজা, যেখানে ঢোকার আগে নিজের দুঃখের ব্যাখ্যা দিতে হয় না। দরকার এমন কিছু পাড়াতো ভাইবোন, যারা হয়তো জানেনও না—তাঁদের বই, গান, সিনেমা কিংবা নিছক ঘরে বসে থাকার অনুমতি একজন ছোট মানুষকে কত দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
আমাদের পরের প্রজন্ম হয়তো সব গান এক ক্লিকেই পেয়ে যাবে, সব সিনেমা স্ট্রিমিংয়ে দেখতে পারবে, সব বই অনলাইনে খুঁজে নেবে। কিন্তু শুধু তথ্য দিয়ে তো আর মানুষ “মানুষ” হয়ে ওঠে না। মানুষকে মানুষ করে অন্য কারও জীবনের ভেতর দিয়ে একটু হাঁটার সুযোগ। একটি অগোছালো বুকশেলফ, একটি পুরোনো গান, একটি অলস বিকেল। একটি অতিরিক্ত চেয়ার!
হৃদয়ের দাবি রাখা মানে কাউকে করুণা করা নয়; নিজের জীবনের ভেতরে এমন একটি সামান্য জায়গা রেখে দেওয়া, যেখানে কোনো ক্লান্ত মানুষ কোনো কারণ না দেখিয়ে নির্দ্বিধায় এসে বসতে পারে।
আমি বেড়ে উঠেছি সেইসব ঘরে,
যেগুলো কোনোদিন আমার ছিল না।
আজ আমি থাকি নিজের ঘরে।
আর রাত গভীর হলে,
তার ভেতর অদৃশ্য হয়ে বসে থাকে
সেই সব হারানো মানুষ।