আমাদের মাথার ভেতরে কি সত্যিই তিনটি মস্তিষ্ক কাজ করে? একটি টিকে থাকার জন্য, একটি আবেগের জন্য, আরেকটি যুক্তি ও চিন্তার জন্য?
বহু বছর ধরে মনোবিজ্ঞান থেকে শুরু করে জনপ্রিয় বই-সিনেমায় এই ধারণা এতটাই প্রচলিত যে অনেকেই এটিকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলে মনে করেন।
কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি মোটেও এত সরল নয়।
১৯৫৯ সালে মার্কিন চিকিৎসক ও গবেষক পল ম্যাকলিন ‘ট্রাইউন ব্রেন’ তত্ত্ব দেন।
তাঁর মতে, মানুষের মস্তিষ্ক তিন স্তরে গড়ে উঠেছে -- সবচেয়ে পুরোনো ‘লিজার্ড ব্রেন’, যা বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে; এরপর ‘লিম্বিক সিস্টেম’, যেখানে আবেগের জন্ম; আর সবচেয়ে নতুন ‘নিওম্যামালিয়ান’ অংশ, যা মানুষকে দিয়েছে ভাষা, যুক্তি ও জটিল চিন্তার ক্ষমতা।
পরবর্তীতে বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারী কার্ল সাগানের লেখার মাধ্যমে এই ধারণা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ১৯৯০-এর দশক থেকেই স্নায়ুবিজ্ঞানীরা দেখাতে শুরু করেন, এই তত্ত্ব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
সরীসৃপেরও লিম্বিক সিস্টেম রয়েছে, আবার মানুষের বিশেষ বলে ধরা নিওকর্টেক্স শুধু মানুষের নয় -- সব স্তন্যপায়ী প্রাণীরই আছে। অর্থাৎ বিবর্তন নতুন মস্তিষ্ককে পুরোনোর ওপর স্তরে স্তরে বসায়নি; বরং বিদ্যমান কাঠামোকেই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও জটিল করেছে।
আজকের গবেষণা বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক অসংখ্য অঞ্চলের সমন্বয়ে কাজ করে। আবেগ, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত কিংবা যুক্তি -- কোনোটিই একটি নির্দিষ্ট অংশের একক দায়িত্ব নয়।
মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করেই আমাদের আচরণ, অনুভূতি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে।
তাহলে ‘লিজার্ড ব্রেন’ ধারণা এত জনপ্রিয় হলো কেন?
বিজ্ঞানীদের মতে, কারণ এটি সহজ, আকর্ষণীয় এবং মনে রাখা সুবিধাজনক। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
মানুষের মস্তিষ্ককে তিনটি আলাদা প্রাণীর লড়াই হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত ও অত্যন্ত জটিল জৈব নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখাই আধুনিক বিজ্ঞানের অবস্থান।