গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় হঠাৎ মনে হলো আপনি অনেক উঁচু স্থান থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন! পরক্ষণেই বুক ধড়ফড়ানি আর শরীর জুড়ে এক তীব্র ঝাঁকুনি নিয়ে ঘুম ভেঙে গেল। এই পরিচিত ও অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি - এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ঘুমের ঘোরে আচমকা কেঁপে ওঠার এই অবস্থাকে বলা হয় ‘হিপনিক জার্ক’ (Hypnic Jerk)।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে - এটি কেন হয় এবং এটি কি আসলে কোনো মারাত্মক স্নায়বিক বা মস্তিষ্কের সমস্যার পূর্বলক্ষণ? এই রহস্যময় অনুভূতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও সতর্কতা নিয়ে সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজা।
হিপনিক জার্ক কী?
ঘুমের মধ্যে উঁচু একটা জায়গা থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি নিয়ে মাঝরাতে জেগে ওঠার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজা।
তার কথায়, এটা যে শুধু আপনারই হচ্ছে তা নয়। দশজনের মধ্যে সাতজনই কোনো না কোনো সময় এমনটা অনুভব করেছেন।
ডা. সিন্ধুজা বলেন, “ব্যক্তি বিশেষে এর তীব্রতা নির্ভর করে। কারো কারো কাছে এটা এতটাই হালকা যে তারা নিজেরা এটা অনুভব করতে পারেন না। পাশে ঘুমিয়ে থাকা কেউ বা পরিবারের লোক সেটা লক্ষ্য করে। কারো ক্ষেত্রে আবার এটা খুব গুরুতরও হতে পারে। এর তীব্রতা এতটাই বেশি যে তারা ঘুম ভেঙে উঠে বসেন।”
ডা. সিন্ধুজা ব্যাখ্যা করেন, “হিপনিক জার্ক আসলে অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচন যা ঘুমের সময় ঘটে। যখন কোনো ব্যক্তি জেগে থাকা অবস্থা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় যান, সেই সময়, অর্থাৎ ঘুমের প্রথম পর্যায়ে বা দ্বিতীয় পর্যায়ে এটা ঘটে।”
আমাদের ঘুম সাধারণভাবে দু'টো প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত- নন র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা এনআরইএম এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম। আর আমাদের ঘুমের চক্র চারটে পর্যায়ে বিভক্ত। এই চারটে পর্যায় ৯০ থেকে ১১০ মিনিট অন্তর পরিবর্তিত হয়।
এন ১- (হালকা ঘুম): এই পর্যায়টা জেগে থাকা এবং ঘুমের মধ্যবর্তী অবস্থা। এই সময় আমাদের পেশী রিল্যাক্স বা শিথিল হতে শুরু করে।
এন ২ (মাঝারি ঘুম): এটা এমন একটা অবস্থা যেখানে হার্টের বিটের হার এবং শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস পায়।
এন ৩ (গভীর ঘুম): ঘুমের এই অবস্থাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় যা শরীরকে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
আরইএম (ড্রিম পোজিশন): এই সময় চোখের তারার ঘোরাফেরা লক্ষ্য করা যায়। এই পর্যায়ের সঙ্গে আমাদের স্বপ্ন দেখারও সম্পর্ক রয়েছে।
ডা. সিন্ধুজা জানিয়েছেন যে এই ঝাঁকুনি প্রথম দুটো পর্যায়ে ঘটে। এই সময় যে অনুভূতিগুলো সাধারণত অনুভূত হয় তা হলো -
- হঠাৎ পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি
- হঠাৎ শক বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো একটা অনুভূতি
- পড়ে যাওয়ার সাথে সম্পর্কিত স্বপ্ন দেখা বা হ্যালুসিনেশন হওয়া
- অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়া
- মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে কথা বলে ওঠা
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশানাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বলছে, এটা মাংস পেশীর আকস্মিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত ঝাঁকুনি। আমরা যখন জেগে থাকা অবস্থা থেকে ঘুমের অবস্থায় যাই তখনই এটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
ডা. সিন্ধুজা বলেন, “এটাকে সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায় না।পেশীর এই ঝাঁকুনি যে কোনো বয়সেই ঘটতে পারে, তবে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়।”
২০১৬ সালে পরিচালিত একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, “হিপনিক জার্ক যে কোনো বয়সের মানুষ অনুভব করতে পারেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, ৬০% থেকে ৭০% মানুষ তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এটা অনুভব করেছেন।”
মার্কিন ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফর্মেশন (এনসিবিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবারই যে ঘুমের মধ্যে এটা হয় তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কোনো রোগের লক্ষণ নয়। কিন্তু পুনরাবৃত্তিক কাঁপুনি স্নায়বিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এর কারণ কী?
বেশিরভাগ সময়, এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। তবে ডা. সিন্ধুজা ব্যাখ্যা করেছেন কয়েকটা ফ্যাক্টর হিপনিক জার্কের সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। যেমন-
চরম ক্লান্তি এবং অনিদ্রা: হিপনিক জার্কের কমন কারণ হলো চরম ক্লান্তি বা বিছানায় সঠিকভাবে শুয়ে না থাকা।
ট্রিগার ফ্যাক্টর: অতিরিক্ত কফি বা ক্যাফেইন, নিকোটিন গ্রহণ ইত্যাদি ট্রিগার ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে এবং পেশীতে কাঁপুনি সৃষ্টি করতে পারে।
স্ট্রেস: খুব বেশি স্ট্রেস বা মানসিক চাপ থাকলে শরীর রিল্যাক্স করতে পারে না। মস্তিষ্ক যখন সতর্ক থাকে তখন তা সহজেই চমকে উঠতে পারে। চিকিৎসা ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে ডিপ্রেশন পেশীতে এই ধরনের ঝাঁকুনির অনুভূতির কারণ হতে পারে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির গবেষণামূলক প্রতিবেদনেও এই তথ্যকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন সেন্টারে তালিকাভুক্ত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ এবং ক্লান্তি ঘুমের সময় ঘটে যাওয়া এই স্বতঃস্ফূর্ত পেশী স্পন্দনের ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ সিস্টেমের মতে, স্ট্রেস ও উদ্বেগ মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এটা জেগে থাকা অবস্থা থেকে গভীর ঘুমে যাওয়ার মসৃণ ট্রান্সিশান (বা পর্বান্তর)কে কঠিন করে তোলে।
কখন এটা সমস্যার কারণ?
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন জানিয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক হলেও ঘন ঘন হিপনিক জার্ক হওয়া ভালো লক্ষণ নয়। ডা. সিন্ধুজা সতর্ক করে বলেন, যদি হিপনিক জার্কের পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে অবিলম্বে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে:
- যদি পেশীর এই তীব্র ঝাঁকুনি প্রতিদিন বা অত্যন্ত ঘন ঘন হতে থাকে।
- ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি হওয়া।
- রাতে ঘুমের সময় তীব্র নাক ডাকার সমস্যা।
- ঘুমন্ত অবস্থায় মুখ দিয়ে লালা বা ফেনা বের হওয়া।
- হাত-পা স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যাওয়া।
- ঘুমের মধ্যে অজান্তেই প্রস্রাব হয়ে যাওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ এগুলো পরবর্তীতে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম), মৃগী রোগ (Epilepsy) বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো স্নায়ুক্ষয়ী রোগের প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে। তাই ঘুমের এই সাধারণ ঝাঁকুনিকে কেবলই ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে নিজের শরীরের গতিপ্রকৃতির ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।