ছুটির দিনে অ্যালার্ম ঘড়িটা বন্ধ করে দিয়ে আরও ঘণ্টাখানেক শুয়ে থাকা - ব্যস্ত জীবনে এর চেয়ে সুখের আর কী হতে পারে! পুরো সপ্তাহের কাজের চাপে যে ঘুমের ঘাটতি হয়েছে, ছুটির দিনে অনেকেই তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু বিষয়টি যদি উল্টোভাবে ভাবা হয়? ধরুন, সামনে আপনার পরীক্ষা বা অফিসের খুব ব্যস্ত সময় আসছে, যখন ঠিকমতো ঘুমানোর সুযোগই পাবেন না। সেই ভবিষ্যতের কথা ভেবে আগেভাগেই কি বাড়তি ঘুমিয়ে নেওয়া সম্ভব?
গবেষকদের একাংশ বলছেন - হ্যাঁ, সম্ভব। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই নতুন ট্রেন্ডকে বলা হচ্ছে ‘স্লিপ ব্যাংকিং’ বা ঘুম জমিয়ে রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনদের মধ্যে এই ধারণা এখন বেশ জনপ্রিয়।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
‘স্লিপ ব্যাংকিং’ আসলে কী?
সহজ কথায়, কম ঘুমের সময় আসার আগেই কয়েক রাত ধরে সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি সময় ঘুমানো। গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করে রাখে। ফলে পরবর্তীতে যখন ঘুমের ঘাটতি দেখা দেয়, তখনো মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা সহজে নষ্ট হয় না। এটি যেন শরীরের জন্য এক ধরনের ‘সেফটি নেট’ বা সুরক্ষাকবচ।
গবেষণা যা বলছে
স্লিপ ব্যাংকিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়:
সেনাসদস্যদের ওপর পরীক্ষা (২০০৯): যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল্টার রিড আর্মি ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ-এর গবেষক ট্রেসি রাপের নেতৃত্বে একদল সেনার ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে ২৪ জন সেনাসদস্যকে দুটি দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে রাতে ৭ ঘণ্টা এবং অন্য দলকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়। পরের সপ্তাহে দুই দলেরই ঘুমের সময় কমিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টা করা হয়। দেখা গেছে, যারা আগে ১০ ঘণ্টা করে ঘুমিয়ে ‘ব্যাংকিং’ করেছিলেন, তারা কম ঘুমের ধকল অনেক ভালো সামলাতে পেরেছেন এবং তাদের মনোযোগও বেশি ছিল।
চিকিৎসকদের ওপর সমীক্ষা (২০২৩): মায়ামির একটি হাসপাতালে দেখা গেছে, নাইট শিফট শুরুর আগে টানা তিন রাত ৯০ মিনিট করে বেশি ঘুমানোর ফলে চিকিৎসকদের কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে।
খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স: রাগবি খেলোয়াড়রা তিন সপ্তাহ ধরে রাতে ১০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে তাদের শারীরিক ধকল কমিয়েছেন। আবার বাস্কেটবল ও টেনিস খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাড়তি ঘুমের কারণে তাদের ক্ষিপ্রতা, সার্ভ করার দক্ষতা ও লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।
পিগি ব্যাংক নাকি ক্রেডিট কার্ড? দ্বিমত যেখানে
সব বিজ্ঞানী অবশ্য এই ‘স্লিপ ব্যাংকিং’ তত্ত্বে পুরোপুরি একমত নন। তাদের মতে, শরীর আসলে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য ঘুম জমা রাখতে পারে না; বরং আমরা যখন বেশি ঘুমাচ্ছি, তখন হয়তো আমরা অতীতের ‘ঘুমের ঋণ’ শোধ করছি।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক এলিজাবেথ ক্লারম্যান বলেন, “ঘুম পিগি ব্যাংকের (মাটির ব্যাংক) মতো নয়, বরং ক্রেডিট কার্ডের মতো। আপনি ঘুমের ঋণ করতে পারেন, কিন্তু আগেভাগে ঘুম জমিয়ে উদ্বৃত্ত রাখতে পারেন না।”
বিজ্ঞানীদের যুক্তি হলো, আমাদের শরীরে ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। হ্যাকেনস্যাক মেরিডিয়ান স্কুল অফ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. পিটার পোলস জানান, ঘুমের মধ্যে হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যার সমাধান হয়।
ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটার অধ্যাপক মাইকেল হাওয়েল জানান, সারাদিন আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরে যেসব বর্জ্য জমে, ঘুমের সময় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষ তা পরিষ্কার করে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে মস্তিষ্ক এই বর্জ্য সরাতে পারে না, যার ফলে মনোযোগ দেওয়া বা নতুন কিছু শেখা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
কখন এবং কীভাবে ঘুম জমা করবেন?
যারা ‘স্লিপ ব্যাংকিং’ করতে চান, তাদের জন্য বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ রয়েছে:
সময়কাল: ব্যস্ত সময় শুরু হওয়ার এক বা দুই সপ্তাহ আগে থেকে প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট বেশি ঘুমান।
সকালে নাকি রাতে: ডা. হাওয়েলের মতে, সকালে অ্যালার্ম দেরি করে দিয়ে একটু বেশি সময় ঘুমানো সহজ, কারণ মানুষ সাধারণত সকালে দেরি করে উঠতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তবে যাদের সকালে তাড়া আছে, তারা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে পারেন।
পাওয়ার ন্যাপ: দিনের বেলা অল্প সময়ের ঘুম বা ‘ন্যাপ’ নেওয়াও ঘুম জমা করার ভালো উপায়। তবে অধ্যাপক ক্লারম্যান সতর্ক করেছেন, এই ন্যাপ যেন ৪৫ মিনিটের বেশি না হয়। বেশি সময় ঘুমালে ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ বা ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা ভারী হওয়ার সমস্যা হতে পারে।
ভবিষ্যতের জন্য জমানো হোক কিংবা অতীতের ঋণ শোধ - রাতে একটু বাড়তি ঘুম শরীরের জন্য উপকারী। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘স্লিপ ব্যাংকিং’ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকতে হলে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং সময়মতো ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।



