Thursday, June 25, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

হঠাৎ শ্বাস নিতে কষ্ট? প্যানিক অ্যাটাক হলে যা করবেন

কিছু কৌশল জানা থাকলে এসময় নিজেকে শান্ত রাখা সম্ভব

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

আপনি হয়তো ঘরে বসে কাজ করছেন বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তীব্র বুক ধড়ফড়ানি শুরু হলো, দম আটকে আসার উপক্রম, হাত-পা কাঁপতে কাঁপতে মনে হলো - এই বুঝি স্ট্রোক হলো বা আমি মারা যাচ্ছি! চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আকস্মিক তীব্র ভয়ের এই চরম অবস্থাকেই বলা হয় প্যানিক অ্যাটাক। 

বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। চিকিৎসকদের মতে, প্যানিক অ্যাটাক কোনো শারীরিক রোগ বা হার্ট অ্যাটাক নয়, বরং এটি তীব্র মানসিক উদ্বেগের একটি চরম বহিঃপ্রকাশ।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, প্যানিক অ্যাটাক শরীরের স্বাভাবিক ‘ফ্লাইট-অর-ফাইট’ এর আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ। ফ্লাইট-অর-ফাইট রেসপন্স হলো যেকোনো বিপদ, ভয় বা হুমকির মুখে মানুষের শরীরের স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া।

মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ কোনো পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক মনে করলে সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় করে। তখন অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয়, পেশিতে বেশি রক্ত পৌঁছায়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বহু বছর আগে বন্য প্রাণী বা শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এই প্রতিক্রিয়া মানুষের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে আধুনিক জীবনে বাস্তব বিপদের বদলে পরীক্ষা, চাকরির চাপ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা উদ্বেগের মতো মানসিক চাপও একই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

প্যানিক অ্যাটাকের সম্ভাব্য কারণ

সাধারণত অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বংশগত বা জেনেটিক কারণ, মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা কিংবা অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো বড় মানসিক আঘাত বা ট্রমা এর পেছনে দায়ী থাকে। যারা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটিতে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি অন্য মানুষের চেয়ে বেশি থাকে।

শান্ত থাকার কৌশল

প্যানিক শুরু হলে মনে হতে পারে, সে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। এটি যেহেতু খুব বেশি স্থায়ী হয় না, তাই কিছু কৌশল জানা থাকলে নিজেকে শান্ত করা সম্ভব। প্যানিক অ্যাটাকের সময় মানুষ খুব দ্রুত নিশ্বাস নিতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হাইপারভেন্টিলেশন’ বলে।

  • ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি’র একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সময়ে নিশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এর জন্য ‘বক্স ব্রিদিং’ ভালো কাজ করে। প্রথমে ৪ সেকেন্ড ধরে নাক দিয়ে গভীর নিশ্বাস নিন। এরপর ৪ সেকেন্ড নিশ্বাস ধরে রাখুন। তারপর ৪ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে বাতাস আস্তে আস্তে বের করে দিন। সবশেষে আবার ৪ সেকেন্ড নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ রাখুন। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
  • পানি শরীরকে শান্ত করে। ঠাণ্ডা পানি স্নায়ুকে শান্ত করতে সাহায্য করে। সম্ভব হলে পানি দিয়ে মুখ ও চোখ পরিষ্কার করে আসুন।
  • প্যানিক অ্যাটাকের সময় ভয় বা দুশ্চিন্তা কাজ করে। একে স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘গ্রাউন্ডিং টেকনিক’ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। এখানে বলা হচ্ছে, চারপাশে চোখ বুলিয়ে এমন ৫টি জিনিস খুঁজুন যা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। এরপর ৪টি জিনিস স্পর্শ করুন (যেমন পোশাক বা চাবির রিং)। ৩টি শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনুন। ২টি জিনিসের ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করুন এবং ১টি জিনিসের স্বাদ অনুভব করুন। এই পদ্ধতিটি আপনার মনোযোগ ভয় থেকে সরিয়ে বর্তমান স্বাভাবিক মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে পারে।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে

আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি-এর একটি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বারবার প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পাশাপাশি যদি দীর্ঘদিন ধরে আবার অ্যাটাক হওয়ার ভয় কাজ করে, তবে সেটি প্যানিক ডিজঅর্ডারের লক্ষণ হতে পারে। আপনি যদি সবসময় এই ভয়ে থাকেন যে ‘আবার কখন অ্যাটাক হবে’, তাহলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘প্যানিক ডিজঅর্ডার’ বলা হয়।

এছাড়া প্যানিক অ্যাটাকের ভয়ে যদি আপনি ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন, জনসমাগম এড়িয়ে চলেন কিংবা অফিসে বা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে না পারেন, তবে প্রফেশনাল থেরাপি নিয়ে দেখতে পারেন। ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি’ প্যানিক অ্যাটাক দূর করার ক্ষেত্রে অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। এই থেরাপির মাধ্যমে মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয় দূর করা সম্ভব।  

প্যানিক অ্যাটাক হলে করণীয়

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা দরকার। কফি, এনার্জি ড্রিংকস এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন। ক্যাফেইন আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় মস্তিষ্ককে প্যানিক অ্যাটাকের ভুল সংকেত পাঠাতে সাহায্য করে।

পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন: ঘুমানোর সঙ্গেও প্যানিক অ্যাটাকের সম্পর্ক রয়েছে। ‘স্লিপ মেডিসিন রিভিউজ’ জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার পরিমিত ঘুম স্নায়ুতন্ত্র শান্ত রাখতে সাহায্য করে । রাতে ঘুমানোর আগে ফোন বা ল্যাপটপের নীল আলো এড়িয়ে চললে ঘুম ভালো হয়, মন থাকে ফুরফুরে।

অহেতুক ভিড় জমাবেন না: আক্রান্ত ব্যক্তির চারপাশে অতিরিক্ত মানুষের ভিড় বা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাকে শ্বাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দিন।

শান্ত থাকুন ও আশ্বস্ত করুন: যিনি আক্রান্ত হয়েছেন তিনি প্রচণ্ড মৃত্যুভয়ে থাকেন। তাই তার সামনে নিজে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত কণ্ঠে বলুন, আমি তোমার পাশে আছি, তুমি নিরাপদ আছো। 

জোরপূর্বক স্থান পরিবর্তন করাবেন না: আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত হয়ে এক জায়গায় বসতে বা শুয়ে পড়তে সাহায্য করুন। তাকে মুক্ত বাতাস বা খোলা জানালার কাছে নিয়ে যেতে পারেন, তবে জোর জবরদস্তি করবেন না। 

প্যানিক শুরু হলে মনে হতে পারে, সে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে এর তীব্রতা কমে আসে, তবে ওই অল্প সময়ই অনেকের কাছে নরকযন্ত্রণার মতো মনে হয়। এজন্য উপরে উল্লিখিত কৌশলগুলো জানা থাকলে নিজেকে শান্ত করা সম্ভব।

   

About

Popular Links

x