Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জেনারেশন আলফা: ভার্চুয়াল জগতে তারা কেউ ‘টাইপ এ’ কেউবা ‘টাইপ বি’

প্রযুক্তি এবং বাস্তব জীবনের ভারসাম্যই জেনারেশন আলফাকে আগামী পৃথিবীর জন্য যোগ্য করে তুলবে  

আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম

২০১০ সালের পর যাদের জন্ম, হাতেখড়ির আগেই তাদের হাতে এসেছে স্মার্টফোন। সমাজবিজ্ঞানীরা এদের নাম দিয়েছেন ‘জেনারেশন আলফা’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রজন্মের বেড়ে ওঠাটা বেশ বিচিত্র। খাবার টেবিলে ইউটিউব আর পড়ার ফাঁকে অনলাইন গেম - এই ডিজিটাল আবহে বড় হওয়া শিশুদের সবার বৈশিষ্ট্য কিন্তু এক নয়। নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, আলফা প্রজন্মের শিশুরা মূলত দুটি চারিত্রিক মেরুতে বিভক্ত। একদল লড়াকু ‘টাইপ বি’, অন্যদল ইন্ট্রোভার্ট ‘টাইপ বি’।

প্রেক্ষাপট

মনোবিজ্ঞানে বা গবেষণায় হুবহু ‘এ/বি টেস্টিং পার্সোনালিটি’ (A/B Testing Personality) নামে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক থিওরি নেই। এটি মূলত একটি ‘মেটাফোর’ বা রূপক, যা বর্তমানের ডিজিটাল প্রজন্মের (জেনারেশন আলফা) আচরণ বোঝাতে গবেষক ও বাজার বিশ্লেষকরা ব্যবহার করছেন।

সহজভাবে বললে, এর উৎসগুলো হলো:

১. মার্কেটিং এবং প্রোডাক্ট ডিজাইনের ধারণা (A/B Testing)

প্রযুক্তি বিশ্বে কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের দুটি ভার্সনের মধ্যে কোনটি ভালো কাজ করে, তা যাচাই করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘A/B Testing’। জেনারেশন আলফার ক্ষেত্রে গবেষকরা দেখছেন, ডিজিটাল পরিবেশ শিশুদের মধ্যে অনেকটা এই পরীক্ষার মতোই দুটি ভিন্ন 'পার্সোনালিটি টাইপ' (Type A এবং Type B) তৈরি করছে।

২. টাইপ এ এবং টাইপ বি পার্সোনালিটি থিওরি

এর মূল ভিত্তি হলো ১৯৫০-এর দশকে কার্ডিওলজিস্ট মেয়ার ফ্রিডম্যান ও রে রোজেনম্যানের দেওয়া ‘Type A and Type B Personality’ থিওরি। তারা মানুষের স্বভাবকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন:

টাইপ-এ: উচ্চাকাঙ্ক্ষী, প্রতিযোগিতামূলক এবং অধৈর্য

রোবলক্স বা ফোর্টনাইটের মতো ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কে কার চেয়ে এগিয়ে থাকবে, তা নিয়ে তাদের উত্তেজনার শেষ নেই। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই শিশুরা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারদর্শী।

জেনারেশন আলফা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন মার্ক ম্যাকক্রিন্ডল (Mark McCrindle)। তার বিভিন্ন রিপোর্ট এবং বইয়ে (যেমন: Generation Alpha) তিনি দেখিয়েছেন যে, এই প্রজন্মের শিশুরা কীভাবে তাদের ডিজিটাল ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব ধারণ করছে। যদিও তিনি সরাসরি 'এ/বি টেস্টিং' শব্দটি ব্যবহার করেননি, তবে তার গবেষণার মূল উপাত্ত থেকেই এই ধারণাটি এসেছে।

তার মতে, আলফা প্রজন্মের টাইপ-এ শিশুরা কেবল প্রযুক্তিতে দক্ষ নয়, তারা পরিবারের বড় বড় সিদ্ধান্তেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া হবে কিংবা কোন ব্র্যান্ডের গ্যাজেট কেনা হবে - এসব ক্ষেত্রে তারা বেশ সোচ্চার। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; সবসময় সেরা হওয়ার এই তীব্র তাগিদ এবং ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রতিনিয়ত নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করা তাদের মধ্যে এক ধরনের সূক্ষ্ম মানসিক চাপ বা ‘এনজাইটি’ তৈরি হয়।  

টাইপ-বি: ধীরস্থির, ধৈর্যশীল এবং সৃজনশীল

টাইপ-এ শিশুদের ঠিক উল্টো মেরুতে আছে টাইপ-বি আলফারা। এরা ইন্টারনেটে প্রচুর সময় কাটালেও এদের কোনো ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশা নেই। জিডব্লিউআই-এর (GWI) সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, এই শিশুরা মূলত ‘প্যাসিভ কনজ্যুমার’। অর্থাৎ তারা কন্টেন্ট দেখে আনন্দ পায়, কিন্তু নিজে সেখানে খুব একটা অংশ নিতে চায় না। এদেরকে বলা হচ্ছে ‘স্টেলথ স্ক্রোলার’।

এই দলের শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল ক্লান্তির বদলে এক ধরণের ‘গো উইথ দ্য ফ্লো’ বা স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাদের কাছে ইন্টারনেট মানেই লড়াই নয়, বরং এক ধরণের বিনোদনের উৎস। মজার বিষয় হলো, অতিরিক্ত ডিজিটাল এক্সপোজারের প্রতিক্রিয়ায় এই প্রজন্মের অনেক শিশুর মধ্যেই আবার এনালগ শখের প্রতি এক ধরণের নীরব টান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা স্ক্রিন ছেড়ে বাগান করা, ডায়েরি লেখা কিংবা ড্রয়িংয়ের মতো সৃজনশীল কাজে প্রশান্তি খুঁজছে।

কতটা এগিয়ে আমাদের শিশুরা?

বাংলাদেশে জেনারেশন আলফা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো জাতীয় সমীক্ষা না হলেও ইউনিসেফ ও ব্র্যাকের ডিজিটাল লিটারেসি বিষয়ক পর্যবেক্ষণগুলো বেশ কিছু সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে ‘টাইপ-এ’ বা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব প্রবলভাবে বাড়ছে। গেমিং আসক্তি আর অনলাইনে প্রতিনিয়ত নিজেকে জাহির করার প্রবণতা তাদের সামাজিক আচরণে বড় পরিবর্তন আনছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা বাস্তব জীবনের বন্ধুদের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ার ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে, এই প্রজন্মের একটি বড় অংশ পরিস্থিতির প্রয়োজনে নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে জানে। তারা হয়তো ভার্চুয়াল জগতে প্রচণ্ড লড়াকু, কিন্তু বাস্তব জীবনে বেশ ধীরস্থির। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অভিভাবকদের উচিত শিশুদের কেবল প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে না দিয়ে তাদের এই মানসিক বৈচিত্র্য বোঝা।

প্রযুক্তি ও বাস্তব জীবনের এই ভারসাম্যই জেনারেশন আলফাকে আগামীর পৃথিবীর জন্য যোগ্য করে তুলবে। তারা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি তথ্যবহুল ও সচেতন। তবে তাদের এই স্মার্টনেসের মাঝে যেন মানবিক অনুভূতি এবং ধৈর্য হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুদের এই মানসিক অবস্থা বুঝে তাদের সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করাই হবে আগামীর টেকসই সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।  

   

About

Popular Links

x