ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের একটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ। টানটান উত্তেজনার এক মুহূর্তে গোলপোস্টের ঠিক সামনে বল নিয়ে দাঁড়িয়ে স্ট্রাইকার - ঠিক তখনই স্ক্রিন জুড়ে শুরু হলো ভিডিও বাফারিং। ওদিকে পাশের ফ্ল্যাট থেকে গোল! গোল! চিৎকার ভেসে এলেও, নিজের ঘরে ওয়াইফাই সিগন্যাল দুর্বল থাকায় ম্যাচের সেই মুহূর্তটি আর দেখাই হলো না।
লাইভ ম্যাচের এমন চরম মুহূর্তের বিড়ম্বনার মুখোমুখি প্রতিদিন দেশের হাজারো ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হচ্ছেন। চড়া মূল্যে উচ্চগতির ওয়াইফাই প্যাকেজ কিনেও ঘরের এক রুমে নেটওয়ার্ক ভালো পাওয়া গেলেও, অন্য রুমে গেলেই যেন গতি থমকে দাঁড়ায়। এই সমস্যার জন্য অনেকেই সরাসরি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএসপি) দায়ী করেন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াইফাইয়ের এই ধীরগতির জন্য সবসময় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা আইএসপি দায়ী থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে রাউটারের অবস্থান, ভুল সেটিংস কিংবা বাড়ির ভেতরের পরিবেশের কারণেও ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে। কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই কয়েকটি সহজ উপায় অবলম্বন করে বাড়ির ওয়াইফাইয়ের গতি ও কাভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
রাউটারের সঠিক অবস্থান ও উচ্চতা নির্ধারণ
ওয়াইফাই সিগন্যালের মান অনেকাংশেই নির্ভর করে রাউটারটি কোথায় রাখা হয়েছে তার ওপর। অনেকেই রাউটার ঘরের এক কোণে বা টেলিভিশনের পেছনে লুকিয়ে রাখেন, যা ভুল। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে রাউটারটিকে বাড়ির মাঝামাঝি কোনো খোলা জায়গায় রাখা উচিত। চারপাশে দেয়াল, দরজা বা বড় আসবাব যত কম থাকবে, সিগন্যাল তত নিরবচ্ছিন্নভাবে ছড়াবে।
এছাড়া রাউটার মেঝেতে বা টেবিলের নিচে না রেখে আলমারি, বুকশেলফ বা দেয়ালের উঁচু তাকে রাখা উচিত। রেডিও তরঙ্গ সাধারণত নিচের দিকে ও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাই উঁচুতে রাখলে কাভারেজ ভালো পাওয়া যায়।
অ্যান্টেনার দিক পরিবর্তন
রাউটারে একাধিক অ্যান্টেনা থাকলে সেগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করে গতি বাড়ানো সম্ভব। যদি দুটি অ্যান্টেনা থাকে, তবে একটি একদম সোজা ওপরের দিকে এবং অন্যটি আড়াআড়িভাবে রাখা উচিত। স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের ভেতরের অ্যান্টেনা একেক ডিভাইসে একেক কোণে থাকে, তাই রাউটারের অ্যান্টেনা ভিন্ন ভিন্ন দিকে থাকলে সংযোগ ভালো পাওয়া যায়।
৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার
বর্তমানের আধুনিক ডুয়াল-ব্যান্ড রাউটারগুলোতে ২.৪ গিগাহার্টজের পাশাপাশি ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহারের সুবিধা থাকে। ব্লুটুথ ডিভাইস বা ওয়্যারলেস মাউসের কারণে ২.৪ গিগাহার্টজ ব্যান্ডটি প্রায়ই ব্যস্ত থাকে। তাই বেশি গতি পেতে ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড বা ডুয়াল-ব্যান্ড মোড ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ ও দুর্বল সিগন্যাল পরীক্ষা
বাড়ির কোন কোন অংশে ওয়াইফাই সিগন্যাল পৌঁছাচ্ছে না বা ‘ডেড জোন’ তৈরি হচ্ছে, তা আগে শনাক্ত করা জরুরি। এ জন্য অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বিভিন্ন ‘ওয়াইফাই অ্যানালাইজার’অ্যাপ বা কম্পিউটারের নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সিগন্যালের শক্তি মেপে রাউটারের অবস্থান নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা যায়।
পাওয়ারলাইন অ্যাডাপ্টার ব্যবহার
সাধারণত একটি মাত্র রাউটার দিয়ে বড় বা দোতলা বাড়ির সব প্রান্তে শক্তিশালী সিগন্যাল পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এই সমস্যার সমাধানে ‘মেশ ওয়াইফাই সিস্টেম’ কিংবা ‘ওয়াইফাই এক্সটেন্ডার’ ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া বিদেশের মাটিতে পাওয়ারলাইন নেটওয়ার্ক অ্যাডাপ্টার (যা বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ছড়ায়) বেশ জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এর প্রচলন এখনো কম।
পুরোনো রাউটারকে রিপিটার হিসেবে ব্যবহার
নতুন ডিভাইস কেনার আগে ঘরে থাকা পুরোনো রাউটারটিকেও কাজে লাগানো সম্ভব। সঠিক সেটিংসের মাধ্যমে পুরোনো রাউটারটিকে রিপিটার বা ব্রিজ হিসেবে সেটআপ করলে তা মূল রাউটারের সিগন্যালকে টেনে নিয়ে দূরবর্তী রুমে পৌঁছে দিতে পারে।
পুরোনো রাউটার বদলে ফেলা
ইন্টারনেট প্যাকেজের গতি যদি ১০০ এমবিপিএস বা তার বেশি হয়, অথচ রাউটারটি যদি ৫-৬ বছরের পুরোনো হয়, তবে পুরোনো প্রযুক্তির কারণেই ইন্টারনেটের গতি থমকে যায়। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের শতভাগ সুবিধা পেতে একটি আধুনিক ডুয়াল-ব্যান্ড কিংবা ‘ওয়াই-ফাই ৬’ সমর্থিত রাউটার ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত রাখা
পাসওয়ার্ড ছাড়া ওয়াইফাই ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। অপরিচিত কেউ আপনার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে। এমনকি ব্যক্তিগত তথ্যও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই রাউটারে ডাব্লিউপিএ২ বা ডাব্লিউপিএ৩ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখুন এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।



