করোনাকালের পর থেকে করপোরেট দুনিয়ায় ‘বার্নআউট’ বা কাজের চাপে চরম মানসিক ক্লান্তি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এর আড়ালে তরুণ প্রজন্মের ওপর ভর করেছে আরেক ধরনের ক্লান্তি -‘ডেটিং বার্নআউট’। ডেটিং অ্যাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানো, একের পর এক মানুষের সাথে চ্যাটিং, মনের মতো মানুষ খুঁজতে গিয়ে মানসিক শক্তির অপচয় এবং দিনশেষে কোনো সম্পর্কেই স্থির হতে না পারার যে হাহাকার, তা নতুন প্রজন্মকে ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্লান্ত করে তুলছে।
তবে এই প্রজন্ম শুধু ক্লান্তি নিয়েই বসে নেই, তারা খুঁজে বের করেছে এর এক দারুণ সমাধান। প্রথম ডেটে নিজেকে নিখুঁত দেখানোর চিরন্তন সামাজিক চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা এখন মেতেছে নতুন এক ট্রেন্ডে, যার নাম - ‘গবলিনটিমেসি’ (Goblintimacy)।
‘গবলিনটিমেসি’ কী?
দিনকয়েক আগেও এক অলিখিত নিয়ম ছিল - প্রথম দেখায় নিজেকে সেরা প্রমাণ করতে হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ, সবচেয়ে দামি পোশাকটি পরা, নিজের ছোটখাটো খুঁত বা বদভ্যাসগুলোকে সযত্নে লুকিয়ে রাখা আর অতিরিক্ত ভদ্রতার মুখোশ পরা - এসবই ছিল সফল ডেটের চাবিকাঠি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিনিয়ত অন্য কেউ সেজে থাকার এই কৃত্রিম প্রচেষ্টাই তরুণদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। এই প্রথা ভেঙেই জন্ম নিয়েছে ‘গবলিনটিমেসি’।
‘গবলিন মোড’ থেকে ‘গবলিনটিমেসি’
শব্দটি এসেছে ২০২২ সালের অক্সফোর্ড ‘ওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হওয়া ‘গবলিন মোড’ থেকে। ইউরোপীয় লোককথার খামখেয়ালি আর সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা না করা কাল্পনিক জীব ‘গবলিন’-এর নামানুসারে এই মোডের জন্ম। গবলিন মোড মানে হলো- সমাজ কী ভাববে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের অগোছালো, অসম্পূর্ণ ও বাস্তব রূপটাকে সহজভাবে মেনে নেওয়া।
আর এই দর্শনের সাথে ‘ইন্টিমেসি’ বা ঘনিষ্ঠতা জুড়ে দিয়ে তৈরি হয়েছে ‘গবলিনটিমেসি’। এর মূল কথা খুব সহজ। সম্পর্কের প্রথম দিন থেকেই কোনো ভণিতা না করে নিজের আসল পরিচয় তুলে ধরা। নিজের অদ্ভুত কোনো অভ্যাস, জীবনের সীমাবদ্ধতা কিংবা অপূর্ণতাগুলোকে লুকিয়ে না রেখে প্রথম দিনই সঙ্গীর সামনে নিজের আসল সত্ত্বা তুলে ধরা।
অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতনামা সম্পর্ক ও প্রেমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. লারভ এ প্রসঙ্গে বলেন, “গবলিনটিমেসি মানুষকে নিজের ভেতরের ভালো, খারাপ এবং অসম্পূর্ণ দিকগুলোকে সহজভাবে গ্রহণ করতে শেখায়। যারা ডেটিংয়ে অবাস্তব নিখুঁত হওয়ার ভান না করে নিজের মতো থাকতে চান, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ধারণা।”
সততা বনাম অসচেতনতা: সীমারেখা কোথায়?
প্রথম ডেটে সৎ থাকা ভালো, কিন্তু তা যেন অন্য পক্ষের জন্য অস্বস্তির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার এই নতুন ট্রেন্ড নিয়ে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, গবলিনটিমেসি চর্চার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের সীমারেখা জানা খুব জরুরি:
যা করা ইতিবাচক: নিজের রূপ বা চেহারা নিয়ে সৎ থাকা, পারিবারিক বা অর্থনৈতিক অবস্থা আড়াল না করা এবং নিজের পড়াশোনা ও ভালো লাগার বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলা।
যেখানে লাগাম টানা উচিত: প্রথম ডেটেই অতিরিক্ত ব্যক্তিগত বা আবেগের কথা প্রকাশ না করা। যেমনঃ প্রথম দেখাতেই প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে কাটানো স্মৃতির রোমন্থন অন্য পক্ষের মনে কষ্ট বা ট্রমা তৈরি করতে পারে।
একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গবলিনটিমেসি মানে কিন্তু ডেটে গিয়ে সঙ্গীর প্রতি উদাসীনতা দেখানো কিংবা অলস ও স্বার্থপর আচরণকে ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দেওয়া নয়। সম্পর্কে পারস্পরিক আগ্রহ, যত্ন আর শ্রদ্ধা বজায় রাখা সব সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গবলিনটিমেসির সবচেয়ে বড় গুণ হলো, এতে প্রথম ডেটেই একজন মানুষকে যতটা চেনা সম্ভব, অবাস্তব মুখোশ পরে থাকলে একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর কাটিয়েও তা সম্ভব হয় না।
একটি সুন্দর সম্পর্কের ভিত্তি কখনো কৃত্রিম হতে পারে না। জেন-জির হাত ধরে জনপ্রিয় হওয়া ‘গবলিনটিমেসি’ আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, নিখুঁত কোনো মানুষ নয়, বরং অসম্পূর্ণ দুটো মানুষের পরম সততা আর একে অপরের খামতিগুলোকে মেনে নেওয়ার নামই আসল ভালোবাসা।