‘আর্লি বার্ড’ নাকি ‘নাইট আউল’ - কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির মুকুট আসলে কার মাথায় ওঠে? প্রচলিত ধারণা বলে, যারা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন, ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সুযোগ তাদেরই বেশি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান কী বলছে? গবেষণার তথ্য বলছে, উত্তরটি নির্ভর করে শুধু কাজের দক্ষতার ওপর নয়, কর্মপরিবেশ ও ব্যবস্থাপকদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও। রাত জেগে কাজ করা কর্মীরা কোনো অংশেই কম দক্ষ নন। তবুও কর্পোরেট সংস্কৃতির কিছু অদৃশ্য নিয়মের কারণে পদোন্নতির লড়াইয়ে দুই দলের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক সূক্ষ্ম ব্যবধান।
ভোরে ওঠা কর্মীরা কি বাড়তি সুবিধা পান
২০১৪ সালে জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সাইকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা কর্মস্থলে আগে পৌঁছান, ব্যবস্থাপকেরা তাদের তুলনামূলক ভালো মূল্যায়ন করেন। গবেষকদের মতে, অনেক ব্যবস্থাপকই সময়ের আগে অফিসে আসাকে দায়িত্বশীলতা হিসেবে দেখেন। ফলে কর্মদক্ষতা একই হলেও আগে আসা কর্মীরা ইতিবাচক মূল্যায়নের কারণে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পরোক্ষ সুবিধা পেতে পারেন।
রাতজাগা মানেই কম উৎপাদনশীল নয়
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রত্যেক মানুষের একটি স্বাভাবিক জৈবিক সময়সূচি বা ক্রোনোটাইপ রয়েছে। কেউ সকালে বেশি কর্মক্ষম, আবার কেউ রাতে। ২০২২ সালে জাপানের ৮,২১৭ জন অফিসকর্মীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রাতজাগা হওয়া নিজেই উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় না। বরং কর্মীরা যখন তাদের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের বিপরীতে কাজ করতে বাধ্য হন, তখনই তাদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
সমান গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টার সময়সূচি
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ৯টা-৫টার প্রচলিত কর্মঘণ্টা অনুসরণ করে। ফলে সকালের বৈঠক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা অফিসে দৃশ্যমান উপস্থিতির ক্ষেত্রে ভোরে ওঠা কর্মীরা বাড়তি সুযোগ পান। এ কারণে তাদের কাজ সহজে নজরে আসে, যদিও রাতজাগা সহকর্মীরাও সমান মানের কাজ করতে পারেন।
সৃজনশীলতা
গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও মানুষের জৈবিক ছন্দ গুরুত্বপূর্ণ। সৃজনশীলতা নির্ভর করে ব্যক্তি কখন সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন, তার ওপর। সকালের মানুষ সকালে এবং রাতজাগা মানুষ সন্ধ্যা বা রাতে তুলনামূলক বেশি সৃজনশীল হতে পারেন।
নমনীয় কর্মপরিবেশ
বিশ্বজুড়ে ধীরে ধীরে নমনীয় কর্মঘণ্টা ও দূর থেকে কাজের সুযোগ বাড়ছে। গবেষকদের মতে, কর্মীরা যদি নিজেদের স্বাভাবিক কাজের সময় বেছে নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে ভোরে ওঠা ও রাতজাগা - উভয় ধরনের কর্মীরাই সমান দক্ষতা দেখাতে পারেন।
পদোন্নতির সম্ভাবনা কার বেশি?
গবেষকদের মতে, কঠোর কর্মঘণ্টা ও প্রচলিত ব্যবস্থাপনা থাকা প্রতিষ্ঠানে ভোরে ওঠা কর্মীরা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। তবে সামগ্রিকভাবে পদোন্নতি নির্ভর করে ধারাবাহিক কর্মদক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ, যোগাযোগদক্ষতা ও অর্জনের ওপর।
তাই শুধু ভোরে ওঠা বা রাতে দেরি করে ঘুমানোর অভ্যাস পদোন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না। বরং নিজের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ অনুযায়ী দক্ষতার সঙ্গে কাজ করাই দীর্ঘ মেয়াদে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
দিনশেষে, সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট 'টাইম জোন' বা সময়সীমা হয় না। ৯টা-৫টার চেনা ছক ভেঙে বিশ্বজুড়ে যখন নমনীয় কর্মঘণ্টার সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সময় এসেছে কর্মীদের ঘুমের অভ্যাস নয়, বরং কাজের মান দিয়ে মূল্যায়নের। ঘড়ির কাঁটা সকালের দিকে নির্দেশ করুক বা মাঝরাতের দিকে - ব্যক্তিগত জৈবিক ছন্দকে সম্মান জানিয়ে নিজের সেরাটা দিতে পারাই হোক পেশাদার জীবনের আসল লক্ষ্য। কারণ, যোগ্য নেতৃত্ব আর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত পদোন্নতির আসল সিঁড়ি। তাই নিজের ক্রোনোটাইপ বা জৈবিক ছন্দকে চিনে নিয়ে দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারাই দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারে সফলতার একমাত্র পথ।