ইংরেজি ‘b’ লিখতে গিয়ে শিশুটি লিখে ফেলল ‘d’। খাতার পাতায় ‘পড়’ হয়ে গেল ‘ড়প’। ক্লাসে শিক্ষক ভাবছেন শিশুটি অমনোযোগী, আর বাড়িতে অভিভাবকরা ভাবছেন অলসতা বা দুষ্টুমি। কিন্তু প্রতিদিনের এই যে ডান-বাম গুলিয়ে ফেলা, বর্ণমালার সাথে এক অদৃশ্য যুদ্ধ - এর পেছনে কি সত্যিই অবহেলা দায়ী?
মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, উত্তরটি ‘না’। শিশুটি অলস নয়, বরং সে লড়াই করছে ‘ডিসলেক্সিয়া’ (Dyslexia) নামের একটি বিশেষ স্নায়বিক ও শিখনজনিত বৈচিত্র্যের সাথে।
ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘তারে জামিন পার’-এর সেই ছোট্ট ছেলে ঈশানের কথা অনেকেরই মনে আছে। ডিসলেক্সিয়ার কারণে তাকে সবাই ভুল বুঝেছিল। কিন্তু একজন শিক্ষক তার সমস্যাটি বুঝতে পারার পরই বদলে যায় তার জীবন। বাস্তব জীবনে বাংলাদেশের অসংখ্য শিশুর ভাগ্যে সেই শিক্ষক বা সেই বোঝাপড়ার মানুষটি জোটে না। তারা নীরবে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে লড়াই করে, যা তাদের প্রয়োজন ও সক্ষমতাকে বুঝে উঠতে পারেনি।
গবেষণার অভাব
বাংলাদেশে ডিসলেক্সিয়া নিয়ে গবেষণা ও তথ্য দুটোই অত্যন্ত সীমিত। সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, প্রায় এক দশক আগে প্রকাশিত ‘Prevalence of Dyslexia in Primary School in Dhaka: Its Effects on Children’s Academic and Social Life’ শীর্ষক এক গবেষণায় পাওয়া যায়, ঢাকার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯.০২% শিশু ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত।
এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বা সার্বিক কোনো নতুন পরিসংখ্যান তৈরি হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের ক্ষেত্র তৈরিতে কিছু উদ্যোগ দেখা গেছে। ২০২৪ সালে গবেষক মো. শাহজালাল বাদশা পরিচালিত ‘Mainstreaming Slow-Pace Learners Through Mobile Assisted Language Learning: A Case of Bengali Primary Level Students with Dyslexia’ গবেষণায় বাংলা ভাষাভাষী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা বাড়াতে মোবাইল প্রযুক্তির সহায়ক ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
ডিসলেক্সিয়া কী?
‘ডিসলেক্সিয়া’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষার ‘ডিস’ (dys) অর্থাৎ ‘অসুবিধা’ এবং ‘লেক্সিস’ (lexis) অর্থাৎ ‘শব্দ’ থেকে। এটি একটি স্নায়ুবিকাশজনিত শেখার সমস্যা, যা পড়া ও বানান শেখার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।
তবে সব ধরনের পড়ার সমস্যাই ডিসলেক্সিয়া নয়। ডিসলেক্সিয়া থাকা অনেক শিশু গল্প শুনে সহজেই বুঝতে পারে, ভাষা বোঝার ক্ষমতাও ভালো থাকে। কিন্তু নিজে বই পড়ে শব্দ চিনতে, অক্ষর বিশ্লেষণ করতে এবং বানান করতে গিয়ে তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে।
বর্ণ যখন গোলকধাঁধা
‘ডিসলেক্সিয়া’ কোনো মানসিক রোগ বা বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি নয়। ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মস্তিষ্ক অক্ষর বা ভাষাকে একটু ভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে। একটি সাধারণ শিশু যেভাবে খুব সহজে অক্ষরের গঠন চিনে ফেলে, ডিসলেক্সিক শিশুর চোখে সেই বর্ণগুলো যেন প্রতিবিম্বের মতো ভেসে ওঠে।
তাদের কাছে ইংরেজি ‘p’ আর ‘q’ কিংবা ‘b’ আর ‘d’ আলাদা করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। শুধু তাই নয়, ডান হাত কোনটি আর বাম হাত কোনটি - তা নির্ধারণ করতেও তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, সঠিকভাবে সহায়তার সুযোগ পেলে এই শিশুদের সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তা সাধারণ শিশুদের ছাড়িয়ে যেতে পারে। আলবার্ট আইনস্টাইন, থমাস আলভা এডিসন, স্টিভ জবস কিংবা টম ক্রুজ-তাদের সবারই শৈশবে ডিসলেক্সিয়া ছিল।
মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে ডিসলেক্সিয়া, ডিসগ্রাফিয়া ও ডিসক্যালকুলিয়াভিত্তিক প্রথম বিশেষায়িত বিদ্যালয় সুরাইয়া আফাজ ডিসলেক্সিয়াবিডি প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মদ শামসুল হুদা।
একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর নয়টি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা তাকে এই উদ্যোগ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষকে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের অনুরোধ করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। বরং ওই শিক্ষার্থীকে মারধরেরও অভিযোগ রয়েছে।সেই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় তার সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
তার মতে, এটি একটি শেখার অসুবিধা, যার কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও যত্ন পেলে শিশুরা এই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই অতিক্রম করতে পারে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে এ বিষয়ে জানা গেছে।
কিডি রকস লিমিটেড স্পেশাল স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবরিনা আক্তার বলছেন, “অনেক অভিভাবকই বুঝতে পারেন না তাদের সন্তানের বিশেষ বিদ্যালয় প্রয়োজন, নাকি শুধু থেরাপিই যথেষ্ট।নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যাগুলো নিজে থেকে সেরে যায় না। প্রয়োজন হয় দ্রুত শনাক্ত করা ও সঠিক সহায়তার।”
তিনি জানান, বর্তমানে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও চিকিৎসক পরিবারের অনেক সদস্যও প্রথমদিকে সন্তানের সমস্যাটি মেনে নিতে চান না।
প্রায় আট বছর ধরে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখনও নানা সমস্যার মুখোমুখি। শিশুরা অতিরিক্ত শব্দ করবে এই আশঙ্কায় অনেক বাড়ির মালিক স্কুল ভাড়া দিতে চান না। দক্ষ থেরাপিস্টেরও তীব্র সংকট রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহজাবীন হক মনে করেন, বাংলাদেশে এখনও ডিসলেক্সিয়া নির্ণয়ের কোনো সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।তিনি মনে করেন, শিশুবিকাশ ব্যবস্থার মধ্যেই ডিসলেক্সিয়া শনাক্তকরণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।
কেমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন
আমাদের শিক্ষা ও শিশুবিকাশ ব্যবস্থাকে শিশুদের এই বিশেষ প্রয়োজন বোঝার মতো সংবেদনশীল হতে হবে। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি, যা:
- খাতার নম্বরের চেয়ে শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে বেশি গুরুত্ব দেবে।
- শিশুকে ‘ব্যর্থ’ ঘোষণা করার আগে তার শেখার সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করবে।
- ভুল করার জন্য শাস্তির বদলে শিশুকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রযোজনীয় প্রযুক্তি ও শিখন সহায়তা (যেমন: দৃশ্যমান ও স্পর্শভিত্তিক পদ্ধতি) দেবে।মোবাইল অ্যাপস বা ডিজিটাল লার্নিং টুলের মাধ্যমে বর্ণ ও শব্দের উচ্চারণ ভিজ্যুয়াল আকারে উপস্থাপন করা।
- বই-খাতার পাশাপাশি বালি, আটা বা রঙিন কাদা/ক্লে দিয়ে বর্ণমালা বানিয়ে শেখানো, যা মস্তিষ্কে অক্ষরের আকৃতি স্পষ্ট করতে সাহায্য করে।
- শিক্ষক ও অভিভাবকদের বকাঝকা বন্ধ করে ধৈর্যের সাথে শিশুর ছোট্ট অগ্রগতিকেও উৎসাহিত করবে।
খাতার পাতায় অক্ষর উল্টে যাওয়া মানে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ উল্টে যাওয়া নয়। কোনো শিশুকে যেন কেবল অক্ষরের সঙ্গে লড়াই করার কারণে নিজের মেধা ও সামর্থ্য প্রমাণের পরীক্ষায় বসতে না হয় - এমন একটি সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য। সামান্য সহানুভূতি, পারিবারিক সমর্থন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলেই এই শিশুরা তাদের ভিন্ন চোখ দিয়ে জয় করে নিতে পারে পুরো বিশ্বকে।