স্বপ্ন নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরোনো। কেন আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের উৎস কোথায় কিংবা এর অর্থ কী - এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আসছেন গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে। এবার বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যাই নয়, বরং স্বপ্নের বিষয়বস্তুকেও নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব হতে পারে।
এ নিয়ে গবেষণা চলছে ‘স্লিপ ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা স্বপ্ন প্রকৌশল নিয়ে। গবেষকদের ধারণা, ঘুমানোর আগে মানুষের মনে নির্দিষ্ট কোনো চিন্তা বা বিষয় প্রবেশ করিয়ে দিলে ঘুমের সময়ের অভিজ্ঞতাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা যেতে পারে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের কৌশল শেখার ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে এবং মানসিক আঘাত মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
স্বপ্নকে প্রভাবিত করার কৌশল
স্বপ্নের বিষয়বস্তু প্রভাবিত করার একটি পদ্ধতি হলো ‘ড্রিম ইনকিউবেশন’। এতে ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়, সমস্যা বা প্রশ্নের ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়। এমনকি ঘুমের সময় মস্তিষ্কে ছোট ছোট অডিও বার্তা বা প্রম্পট পাঠিয়েও স্বপ্নকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের লেখক ও শিল্পী উইল ডাউড এই পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। ঘুমের সময় কবিতা পাঠের রেকর্ডিং শুনে তিনি নিজের স্বপ্নে নানা ধরনের চিত্রকল্পের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। কখনো তিনি স্বপ্নে বন্যায় বিধ্বস্ত একটি রহস্যময় শহর দেখেছেন, আবার কখনো চাঁদের আলোয় ঢেউয়ের ওপর শেয়ালের সঙ্গে ছুটে চলার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
তার এসব স্বপ্ন পরবর্তী সময়ে তার একটি বইয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, এ ধরনের স্বপ্ন তাকে একধরনের মুক্তির অনুভূতিও দিয়েছে।
প্রযুক্তি দিয়ে স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
স্বপ্নকে বাইরের উদ্দীপনার মাধ্যমে প্রভাবিত করার ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০০০ সালের শুরুর দিকে এ বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট স্টিকগোল্ড লক্ষ্য করেন, ‘টেট্রিস’ ভিডিও গেম খেলে ঘুমাতে যাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই স্বপ্নে গেমটির মতো বিভিন্ন আকৃতির পতনশীল বস্তু দেখছেন। পরে বিষয়টি ‘টেট্রিস এফেক্ট’ নামে পরিচিত হয়।
বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সঙ্গে কাজ করা গবেষকেরা স্বপ্নকে আরও নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
গবেষক ড. অ্যাডাম হার হোরোউইৎজের তৈরি ‘ডর্মিও’ নামের একটি যন্ত্র ঘুমের সময় মানুষের শারীরবৃত্তীয় সংকেত পর্যবেক্ষণ করে এবং কানে শোনা যায় এমন প্রম্পট দেয়। ঘুম ও জেগে থাকার মধ্যবর্তী ‘হিপনাগোজিয়া’ পর্যায়ে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এক গবেষণায় ৭০%-এর বেশি অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, ডর্মিও ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে স্বপ্ন দেখার নির্দেশ পাওয়ার পর তারা সেই বিষয় নিয়েই স্বপ্ন দেখেছেন।
মানসিক আঘাত মোকাবিলায় সম্ভাবনা
স্বপ্নের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানসিক আঘাত মোকাবিলাতেও কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়ার লুকাস তার কিশোর ছেলে জেনকে হারানোর পর দীর্ঘদিন দুঃস্বপ্ন দেখতেন। তবে স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারের পর অ্যানেস্থেসিয়া থেকে জেগে ওঠার সময় তিনি ছেলেকে নিয়ে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। ওই স্বপ্ন তাকে সান্ত্বনা দেয় এবং এরপর তার দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্নের ধারাবাহিকতাও থেমে যায়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা তার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষক ড. পিলেরিন সিক্কার মতে, অস্ত্রোপচারের পর মানুষকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলার প্রক্রিয়া চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে স্বপ্নকে কাজে লাগিয়ে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিএসটিডি), উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি একদিন ‘স্বপ্নের ক্লিনিক’ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
স্বপ্ন নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন
স্বপ্নকে প্রভাবিত করার প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, এর নৈতিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ২০২১ সালে মার্কিন বিয়ার ব্র্যান্ড কুর্স ‘ড্রিম ইনকিউবেশন’ ব্যবহার করে একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। সেখানে ঘুমানোর আগে দর্শকদের নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে তারা পণ্যটি নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।
এ ঘটনায় কয়েকজন বিজ্ঞানী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিজ্ঞাপনে ড্রিম ইনকিউবেশন ব্যবহারের সমালোচনা করে খোলা চিঠি লেখেন। তাদের আশঙ্কা, মানুষের ঘুম ও স্বপ্নও যদি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রভাবিত করা শুরু হয়, তাহলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও বাণিজ্যিক ব্যবহারের আওতায় চলে আসতে পারে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ নিয়ে আশঙ্কা কিছুটা অতিরঞ্জিত। তাদের মতে, সাধারণ বিজ্ঞাপনের তুলনায় স্বপ্নকে প্রভাবিত করার এই পদ্ধতির প্রভাব এখনও খুব তীব্র নয়।
গবেষণা যত এগোচ্ছে, স্বপ্নকে আর মনের নিষ্ক্রিয় একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। একদিকে এটি মানসিক স্বাস্থ্য ও সৃজনশীলতার জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, অন্যদিকে মানুষের অবচেতন জগতকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কাও তৈরি করছে।



