Sunday, July 26, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কেন বেশিরভাগ মানুষ ডান হাত ব্যবহার করে?

এর উত্তর আছে মানব মস্তিষ্কের গঠন, বিবর্তনের ইতিহাস এবং ভাষার বিকাশের গভীরতায়

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম

লেখা থেকে খাওয়া - প্রায় সব কাজে বেশিরভাগ মানুষ ডান হাত ব্যবহার করে থাকে। পৃথিবীর প্রায় ৯০% মানুষ ডানহাতি। যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ নাটালি উয়োমিনির মতে, ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এমন কোনো মানব জনগোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়নি, যেখানে বাঁহাতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। অর্থাৎ, ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা মানবজাতির একটি প্রায় সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য।

তবে এই প্রবণতা কেন তৈরি হলো? এর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বিবর্তন, মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি এবং প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানব মস্তিষ্কের গঠন, বিবর্তনের ইতিহাস এবং ভাষার বিকাশের গভীরতায়।

ইতিহাসে কোথাও বাঁহাতির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই

মানুষের হাত ব্যবহারের এই পক্ষপাতের সূচনা আসলে মস্তিষ্ক থেকেই। মানুষের মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ শরীরের ডান অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, আর ডান গোলার্ধ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের বাম অংশ। স্নায়ুতন্ত্রের এই ‘ক্রসওভার’-এর কারণেই অধিকাংশ মানুষের ডান হাত বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

৫০ কোটি বছরের পুরোনো এক বিবর্তনের গল্প

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের মধ্যে কাজের বিভাজনের ইতিহাস প্রায় ৫০ কোটি বছরের পুরোনো। বাম গোলার্ধ মূলত অভ্যাসগত ও ধারাবাহিক কাজ পরিচালনা করে, যেমন - খাদ্য সংগ্রহ বা নিয়মিত কর্মকাণ্ড। অন্যদিকে ডান গোলার্ধের কাজ হলো পরিবেশে হঠাৎ কোনো বিপদ বা পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো।

এই বৈশিষ্ট্য শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও একই ধরনের স্নায়বিক পক্ষপাত দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রাণী ডান চোখে দেখা শিকারকে আক্রমণ করার প্রবণতা বেশি দেখায়, যা মস্তিষ্কের দুই অংশের ভিন্ন দায়িত্বেরই একটি প্রতিফলন।

আদিম মানুষের মধ্যেও ছিল ডানহাতির প্রমাণ

প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতত্ত্ববিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৬ লাখ বছর আগে তৈরি পাথরের প্রাচীনতম হাতিয়ারগুলোর নির্মাতারাও মূলত ডানহাতি ছিলেন। এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে, আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাবেরও আগে, এমনকি হোমো ইরেক্টাস পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই হোমিনিনদের মধ্যে ডান হাতে কাজ করার প্রবণতা গড়ে উঠেছিল।

নিয়ানডারথালদের জীবাশ্ম থেকেও একই ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের সামনের দাঁতে এমন ক্ষয়ের চিহ্ন মিলেছে, যা পাথরের হাতিয়ার বাঁ দিক থেকে ডান দিকে টানার সময় তৈরি হয়। এ ধরনের দাগ সাধারণত ডানহাতিদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এমনকি ছয় থেকে আট বছর বয়সী নিয়ানডারথাল শিশুর দাঁতেও একই চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা কোনো বয়সে শেখা অভ্যাস নয়; বরং এটি জন্মগত বৈশিষ্ট্য।

দুই পায়ে হাঁটার পর বদলাতে শুরু করে হাতের ব্যবহার

জ্ঞানবিজ্ঞানী স্টেফানি ব্র্যাকিনি ও তার সহকর্মীরা ‘জার্নাল অব হিউম্যান ইভোলিউশন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষের পূর্বপুরুষ যখন চার পায়ে হাঁটা ছেড়ে দুই পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখে, তখন হাত দুটি নতুন ধরনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ পায়। সেই সময় থেকেই একটি হাতকে অন্যটির তুলনায় বেশি ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হতে থাকে।

শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। চার পায়ে চলার সময় তারা কোনো নির্দিষ্ট হাতকে বেশি ব্যবহার করে না। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করার সময় একটি নির্দিষ্ট হাতের প্রতি পক্ষপাত তৈরি হয়। তবে তাদের ক্ষেত্রে ডানহাতি ও বাঁহাতির সংখ্যা প্রায় সমান।

প্রাচীন হাতিয়ারও দিচ্ছে বিবর্তনের প্রমাণ

গবেষকেরা নিজেরাই প্রাচীন পাথরের হাতিয়ার তৈরি করে ডানহাতি ও বাঁহাতিদের দিয়ে ব্যবহার করান। এরপর সেই দাগের সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের তুলনা করেন। এতে দেখা যায়, দুই কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো হাতিয়ারে ডানহাতির সুস্পষ্ট প্রমাণ খুব একটা নেই। তবে কেনিয়ার কুবি ফোরা অঞ্চলে প্রায় ১৫ লাখ বছর আগে হোমো হ্যাবিলিস ও হোমো ইরেক্টাসের তৈরি হাতিয়ারে ডানহাতি ব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এছাড়া প্রায় ৬ লাখ বছর আগে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস প্রজাতির দাঁতের ক্ষয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করেছেন, তারা প্রধানত ডান হাত দিয়েই খাবার মুখে তুলত। অর্থাৎ, এই সময়েই ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। 

কেন ডানহাতিরাই বেশি? বিজ্ঞানীদের তিন ব্যাখ্যা

ডানহাতি হওয়ার কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বিবর্তনের সুবিধা: সূক্ষ্ম ও নিখুঁত কাজের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি হাত প্রধান ভূমিকা পালন করে, অন্য হাত সহযোগিতা করে। দীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় যাদের শরীর ও স্নায়ুতন্ত্র এ ধরনের কাজে বেশি দক্ষ ছিল, তারাই টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে। ফলে ডান হাত ধীরে ধীরে প্রধান হাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

ধারাবাহিক কাজের দক্ষতা: বিজ্ঞানীদের আরেকটি মত হলো, ক্রমানুসারে সম্পন্ন করতে হয় এমন জটিল কাজ পরিচালনায় মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ বেশি দক্ষ। ফলে সরঞ্জাম তৈরি বা সূক্ষ্ম হাতের কাজের জন্য ডান হাত স্বাভাবিকভাবেই বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

জিনগত প্রভাব: গবেষকদের একাংশ মনে করেন, ডানহাতি বা বাঁহাতি হওয়ার পেছনে জিনগত প্রভাবও রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো একক জিন শনাক্ত করা যায়নি, যা একাই এই বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। বরং একাধিক জিন ও পরিবেশগত প্রভাব মিলেই এটি গড়ে ওঠে।

ভাষার বিকাশ কি ডানহাতিদের এগিয়ে দিয়েছে

ডানহাতির প্রাধান্য ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীদের একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো ‘হোমো লোকোয়েন্স’ তত্ত্ব।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের মধ্যে কাজের বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। পরে ভাষার বিকাশ সেই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ ভাষা প্রক্রিয়াকরণের কেন্দ্রও মূলত মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে অবস্থিত, যা শরীরের ডান দিক নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে এই তত্ত্ব সরাসরি প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ বিলুপ্ত মানবপ্রজাতির মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্র পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই ডানহাতির প্রাধান্যের প্রকৃত কারণ হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা যাবে না।

বাঁহাতি হওয়া কি কোনো অসুবিধা?

একেবারেই নয়। ১৯৭৭ সালে Psychological Bulletin-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাঁহাতি হওয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক ঘাটতির সম্পর্ক নেই।

বরং কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার পর বাঁহাতিরা তুলনামূলক দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। এ ছাড়া বক্সিং, কুস্তি বা অন্যান্য লড়াইভিত্তিক খেলায় বাঁহাতিদের বাড়তি সুবিধা থাকে। কারণ অধিকাংশ প্রতিপক্ষ ডানহাতি হওয়ায় তারা বাঁহাতিদের কৌশলের সঙ্গে কম পরিচিত।

শেষ কথা

হাতের পক্ষপাত শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও এমন প্রবণতা দেখা যায়। তবে মানুষের ক্ষেত্রে ডান হাতের এত বেশি আধিপত্য বিবর্তনের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।

গবেষকদের ধারণা, সোজা হয়ে হাঁটা, সরঞ্জাম তৈরি, ভাষার বিকাশ, মস্তিষ্কের বিশেষায়িত গঠন এবং জিনগত প্রভাব - সব মিলিয়েই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষকে ডানহাতি করে তুলেছে। যদিও এই রহস্যের সব উত্তর এখনও মেলেনি, তবু এটি মানব বিবর্তনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলোর একটি।

   

About

Popular Links

x