Thursday, August 06, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে ৫ বৈশিষ্ট্যের মানুষ দীর্ঘদিন বাঁচে

গবেষণা বলছে, মানুষের ব্যক্তিত্ব দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পেতে মানুষ কত কিছুই না করে। কেউ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনেন, কেউ নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, আবার কেউ মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসবের পাশাপাশি একজন মানুষের ব্যক্তিত্বও দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘায়ু ও ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে আলোচিত গবেষণাটি ২০১৫ সালে ‘Psychological Science’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ‘Your Friends Know How Long You Will Live: A 75-Year Study of Peer-Rated Personality Traits’ শীর্ষক এই গবেষণা পরিচালনা  করেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের মনোবিজ্ঞানী জোশুয়া জে. জ্যাকসন ও তার সহকর্মীরা। ৬০০ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে বন্ধুদের দেওয়া ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নের সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়।

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য শুধু মানুষের আচরণ বা সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে না, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও আয়ুর সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকদের মতে, কিছু বৈশিষ্ট্য জন্মগত হলেও পরিবেশ, শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও দৈনন্দিন অভ্যাসের মাধ্যমে এগুলো অনেকটাই গড়ে ওঠে।

আরও একটি বিষয় গবেষকদের নজরে এসেছে - নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমরা যা ভাবি, তার চেয়ে অনেক সময় আমাদের বন্ধু বা কাছের মানুষগুলো আরও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন করতে পারেন।

দায়িত্বশীল স্বভাবের মানুষ কেন এগিয়ে

দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক পাওয়া গেছে দায়িত্বশীলতার। প্রায় ৭৫ বছর ধরে পরিচালিত এক গবেষণায় ৩০০ দম্পির জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, যেসব পুরুষকে দায়িত্বশীল, নিয়ম মেনে চলা, সতর্ক এবং কাজের প্রতি আন্তরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি দিন বেঁচেছিলেন।

গবেষকদের ব্যাখ্যা, দায়িত্বশীল মানুষ সাধারণত স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন থাকেন। তারা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলেন এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেন। এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

২০০৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় পরিচালিত আরেকটি গবেষণাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়। সেখানে শৈশব থেকেই দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের গড় আয়ু অন্যদের তুলনায় বেশি ছিল।

নতুন অভিজ্ঞতাকে স্বাগত জানানোর অভ্যাস

শুধু নিয়মশৃঙ্খল জীবন নয়, নতুন বিষয় জানার আগ্রহও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নতুন ধারণা, নতুন অভিজ্ঞতা কিংবা ভিন্ন মতামতকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন, তাদের দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনাও বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন কিছু শেখার অভ্যাস মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে, সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং বয়সজনিত মানসিক অবক্ষয় ধীর করতে সহায়ক হতে পারে। ফলে বার্ধক্যেও মানসিক সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে।

মানসিক স্থিতিই বড় শক্তি

গবেষণায় নারীদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে - মানসিক স্থিতিশীলতা। জীবনে চাপ, হতাশা বা উদ্বেগ থাকবেই। তবে যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সাধারণত ভালো থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের সমস্যা এবং আরও নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই মানসিক স্থিতিশীলতা সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি।

বন্ধুত্বপূর্ণ ও সামাজিক স্বভাবের মানুষ এগিয়ে

মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারা, অন্যকে সহযোগিতা করা এবং ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভ্যাসও দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ৯৫ থেকে ১০০ বছর বয়সী ২৪৩ জন প্রবীণকে নিয়ে করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং সামাজিক স্বভাবের। তারা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পছন্দ করতেন এবং একাকিত্বে ভুগতেন না। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতার মাত্রাও তুলনামূলক বেশি ছিল।

অনুভূতি প্রকাশ করাও জরুরি

অনেকে নিজের দুঃখ, রাগ কিংবা আনন্দ প্রকাশ না করে ভেতরে চেপে রাখেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, আবেগ প্রকাশের অভ্যাসও সুস্থ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

শতবর্ষের কাছাকাছি বয়সী ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, তারা নিজেদের অনুভূতি পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হাসিখুশি থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখাও তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ব্যক্তিত্বই দীর্ঘ জীবনের একমাত্র কারণ। দীর্ঘ জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাও মানুষের ব্যক্তিত্বকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

ব্যক্তিত্ব কি বদলানো যায়?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যক্তিত্বের কিছু দিক জন্মগত হলেও অনেক বৈশিষ্ট্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। নিয়মিত জীবনযাপন, নতুন কিছু শেখার অভ্যাস, ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, নিজের আবেগ প্রকাশ এবং দায়িত্বশীল আচরণের চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক উন্নত করা সম্ভব।

অর্থাৎ দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন শুধু ভালো খাবার, ব্যায়াম বা চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, অন্যের প্রতি আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও সুস্থ বার্ধক্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

   

About

Popular Links

x