আমরা প্রায়ই ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাই। কিন্তু নাম বা পরিচিত শব্দ যখন কিছুতেই মনে পড়ে না, তখন অনেকেই বলেন - কথাটা পেটে আসছে, কিন্তু ঠিক মুখে আসছে না।
হঠাৎ করে নাম ভুলে যাওয়া, পরিচিত শব্দও মাথা থেকে একেবারে উধাও হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার নাম ‘টিপ-অফ-দ্য-টাং’। এটি কোনো নতুন রোগ নয়, বরং স্মৃতিভ্রমেরই একটি অংশ। এর মানে শব্দটি বা নামটি মস্তিষ্ক থেকে মুছে গিয়েছে তা নয়, বরং সেটি মনে করার যে প্রক্রিয়া, সেখানে বাধা তৈরি হচ্ছে। ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ মস্তিষ্কের স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই অংশটির সঙ্গে ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সংযোগ থাকে। সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই গোলমাল শুরু হয়।
ধরা যাক, কোনো নাম বা পরিচিত শব্দ যা আগে শুনেছেন বা জানেন সেটি বলতে যাবেন। তখন স্মৃতি থেকে সেই শব্দটি সংযোগ পথের মাধ্যমে ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে এসে পৌঁছাবে। স্মৃতির সঙ্কেত ভাষায় রূপান্তরিত হবে। তখন সেটি উচ্চারণ করা যাবে। কিন্তু এই পথটাই যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন নাম বা শব্দটি স্মৃতিতে থেকে গেলেও সেটি ঠিক ভাষায় রূপান্তরিত হবে না। ফলে নামের সঙ্গে জড়িত বিষয়, জায়গা বা ব্যক্তির চেহারা মনে পড়লেও, সেটি ঠিক ভাষায় ব্যাখ্যা করে বলতে পারবেন না।
বিষয়টা কী অস্বাভাবিক?
কথা বলার সময়ে খুব জানা একটি শব্দ বা নাম হঠাৎ মনে না পড়ার সমস্যা অনেকেরই হয়। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যাটি যদি প্রায়ই হতে থাকে, চেনা নাম বা পরিচিত শব্দও বলার ঠিক আগের মুহূর্তে ভুলে যেতে থাকেন, তা হলে সেটি চিন্তার। ক্ষণিকের জন্য স্মৃতিভ্রম অনেকেরই হয়, তবে তা দিনের পর দিন চলতে থাকলে তখন সেটি স্নায়বিক রোগের লক্ষণ হতে পারে।
কেন এমন হয়
‘টিপ অফ দ্য টাং’ সমস্যাটি সাধারণ। কিন্তু এই ভুল সবসময় হতে থাকলে তখন সেটি স্মৃতিনাশের লক্ষণ বলেই ধরে নিতে হবে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অত্যধিক মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি, কম ঘুমের কারণে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর সঙ্কেত আদান-প্রদানের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ভুলে যাওয়ার সমস্যা বাড়ে। মাথায় গুরুতর আঘাত, দীর্ঘদিন ধরে মদ্যপানের কারণে সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ হতে পারে।
কখন বিষয়টি উদ্বেগের হতে পারে?
শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যা যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে, দৈনন্দিন কথাবার্তায় বাধা সৃষ্টি করে বা স্মৃতি ও চিন্তাভাবনার অন্য পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ, শ্রবণশক্তির সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ ও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
বারবার পরিচিত নাম বা সাধারণ শব্দ ভুলে যাওয়া, কথাবার্তার ফ্লো অনুসরণ করা বা নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে সমস্যা হওয়া এবং কাছের মানুষদের আচরণ বা স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পরিচিত জায়গায় পথ হারানো, বিভ্রান্তি বা দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হলে আরও আগে সতর্ক হতে হবে। শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যা যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং তার সঙ্গে কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের দুর্বলতা বা বিভ্রান্তি হলে তা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এই ক্ষেত্রে দ্রুত জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন। অন্যথায় প্রাণহানি হতে পারে।
স্মৃতি ভালো রাখতে যা করবেন
পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ স্মৃতিশক্তি ও সামগ্রিক মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে একসঙ্গে অনেক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে একটি কাজ শেষ করে অন্য কাজে মন দেওয়া উপকারী হতে পারে।



