কেউ কথা বলার সময় চোখে চোখ রাখছেন না, বারবার নড়াচড়া করছেন, নাক চুলকাচ্ছেন কিংবা হাত গুটিয়ে বসে আছেন - এমন আচরণ দেখলেই অনেকের মনে হতে পারে, তিনি হয়তো মিথ্যা বলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন নানা সংকেতকে মিথ্যা শনাক্তের উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কিন্তু সত্যিই কি মানুষের চোখ, হাত-পা কিংবা মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা সম্ভব তিনি মিথ্যা বলছেন কি না? মিথ্যা বললেই যদি পিনোকিওর মতো নাক লম্বা হয়ে যেত, তাহলে মিথ্যাবাদী চেনা বেশ সহজ হতো। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন কোনো সর্বজনীন সুনির্দিষ্ট সংকেত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘বিবিসি সাইন্স ফোকাস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিথ্যা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শরীরী ভাষার কোনো একক সংকেতকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া-ওকানাগানের ‘ট্রুথ অ্যান্ড ট্রাস্ট ল্যাব’-এর পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক লিয়ান টেন ব্রিঙ্কসহ গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে মিথ্যাবাদী ও সত্যবাদীকে আলাদা করার মতো নির্দিষ্ট আচরণ খুঁজছেন।
চোখে চোখ না রাখা কি মিথ্যার প্রমাণ?
মিথ্যা বলার সময় মানুষ চোখ এড়িয়ে চলে - এমন ধারণা বেশ প্রচলিত। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো গবেষণায় চোখের যোগাযোগকে মিথ্যার নিশ্চিত সংকেত হিসেবে পাওয়া যায়নি। কেউ বেশি বা কম চোখের যোগাযোগ করছেন - দুটোর কোনোটিকেই আলাদাভাবে মিথ্যার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
এর পেছনে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ভূমিকা রয়েছে। কিছু সংস্কৃতিতে কথা বলার সময় দীর্ঘক্ষণ চোখে চোখ রাখা অস্বস্তিকর বা অশোভন বলে মনে করা হয়। ফলে শুধু চোখের দিকে তাকানোর ধরন দেখে কারও সত্য-মিথ্যা বিচার করলে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
হাত-পায়ের নড়াচড়া কি কিছু বলে?
শরীরী ভাষার মধ্যে হাতের অঙ্গভঙ্গি, ভ্রু কুঁচকানো, হাসি, মুখের পরিবর্তন, চোখ সরু করা কিংবা হাত গুটিয়ে রাখার মতো নানা আচরণ রয়েছে। এর কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে করেন, আবার কিছু আচরণ অবচেতনভাবেই ঘটে।
যুক্তরাজ্যের এজ হিল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিওফ বিটি মানুষের কথা ও হাতের অঙ্গভঙ্গির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, মিথ্যা বলার সময় মানুষ তুলনামূলক কম হাত নাড়াতে পারে; কখনো হাতের অঙ্গভঙ্গি কথার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণও হতে পারে। তবে এটিকেও মিথ্যা শনাক্তের নিশ্চিত উপায় বলা যায় না।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মিথ্যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ২৫৩টি গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সত্য ও মিথ্যা আলাদা করার সামগ্রিক সাফল্যের হার ছিল মাত্র ৫৩% - যা অনুমান করে উত্তর দেওয়ার হারের চেয়ে সামান্য বেশি। গবেষণায় এফবিআই, সিআইএ ও ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এজেন্টদের ক্ষেত্রেও মিথ্যা শনাক্তের সাফল্য খুব বেশি দেখা যায়নি।
মুখের ক্ষণিকের অভিব্যক্তি (মাইক্রো-এক্সপ্রেশন)
মাইক্রো-এক্সপ্রেশন বা মুখের খুব অল্প সময়ের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে নাক কুঁচকে যাওয়া, সামান্য হাসি বা দ্রুত বদলে যাওয়া আবেগের প্রকাশ থাকতে পারে। কিছু গবেষক মনে করেন, এসব ক্ষণিকের অভিব্যক্তি মানুষের প্রকৃত আবেগের কিছুটা ইঙ্গিত দিতে পারে।
লিয়ান টেন ব্রিঙ্কের গবেষণাতেও মানুষের মুখে আবেগ আড়াল করার সময় এমন ক্ষণস্থায়ী ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ অভিব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে সাধারণ মানুষ শুধু তা দেখে নির্ভুলভাবে সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে পারেননি। অর্থাৎ মাইক্রো-এক্সপ্রেশন থাকলেও সেটিকে সরাসরি মিথ্যার প্রমাণ বলা যায় না।
‘স্বাভাবিক আচরণ’ ধরে পরীক্ষা
শরীরী ভাষা নিয়ে কাজ করা কিছু বিশেষজ্ঞ ‘বেসলাইন’ বা স্বাভাবিক আচরণ বোঝার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সাধারণ অবস্থায় কীভাবে কথা বলেন, কতটা নড়াচড়া করেন বা চোখের যোগাযোগ কেমন রাখেন - সেটি আগে পর্যবেক্ষণ করা। এরপর নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে কথা বলার সময় তার আচরণে পরিবর্তন আসছে কি না, তা মেলানো।
তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভিন্ন ধরনের প্রশ্নে মানুষের স্বাভাবিক আচরণ বদলে যাওয়া স্বাভাবিক। নিজের নাম জিজ্ঞেস করার সময় একজনের অবয়ব যেমন থাকবে, কোনো গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হলে তা এক না-ও থাকতে পারে। ফলে আচরণের পরিবর্তন মানেই তা মিথ্যার সংকেত নয়।
ব্যক্তিগত ধারণা ও মানসিক চাপ
মিথ্যা শনাক্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পক্ষপাত বড় ভূমিকা রাখে। কাউকে আগে থেকেই সন্দেহজনক মনে হলে তার সামান্য অস্বাভাবিক আচরণকেও মানুষ মিথ্যার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেয়।
অথচ একই আচরণের পেছনে মিথ্যা ছাড়া অন্য কারণও থাকতে পারে। মানসিক চাপ, অস্বস্তি কিংবা পরিস্থিতির প্রভাবেও মানুষের আচরণ বদলাতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
শরীরী ভাষার ভুল ব্যাখ্যা কেবল দৈনন্দিন জীবনে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে না, বিচারব্যবস্থাতেও এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিনসেন্ট দ্যনো ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার আদালতের ৬০২টি মামলা বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ৪৫টি মামলায় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি শরীরী ভাষার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে গবেষকদের মতে, মানুষের চিন্তা বা চরিত্র সম্পর্কে শরীরী ভাষা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে প্রবণতা, বাস্তবে তা মোটেও ততটা নির্ভরযোগ্য নয়।
তাহলে মিথ্যা বোঝার উপায় কী?
গবেষকদের পরামর্শ, শরীরী ভাষার চেয়ে কী বলা হচ্ছে, বক্তব্য কতটা বিস্তারিত এবং কথার মধ্যে অসঙ্গতি আছে কি না - এসবের দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত।
লিয়ান টেন ব্রিঙ্ক জানান, শরীরী ভাষার বিভিন্ন জটিল সংকেত একসঙ্গে না দেখে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য কতটুকু বিস্তারিত বা সুস্পষ্ট, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি কার্যকর। তার গবেষণায় দেখা গেছে, মৌখিক সংকেত বিশ্লেষণের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পেলে মানুষের মিথ্যা শনাক্তের দক্ষতা কিছুটা বাড়ে।
অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড ওয়াইজম্যানও শরীরী ভাষার চেয়ে কথার সংকেতের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেছেন। তার মতে, উত্তর দিতে দেরি হওয়া, বক্তব্যে তথ্যের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা নির্দিষ্ট কিছু শব্দের ব্যবহারে পরিবর্তন আসার বিষয়গুলো খেয়াল করা যেতে পারে। তবে এতেও শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
শেষ কথা
শরীরী ভাষা মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটিকে মিথ্যা শনাক্তের একক ফর্মুলা বলা যায় না। চোখে চোখ না রাখা, বারবার নড়াচড়া করা, নাক চুলকানো, হাত গুটিয়ে রাখা কিংবা মুখের সংবেদনশীল কোনো পরিবর্তন - কোনোটিই একা প্রমাণ করে না যে কেউ মিথ্যা বলছেন।
সুতরাং একটি নির্দিষ্ট আচরণ দেখেই কাউকে মিথ্যাবাদী ধরে নেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। বরং বক্তার মূল বক্তব্য, তথ্যের গভীরতা এবং কথার ধারাবাহিকতা বা অসঙ্গতি পরখ করাই মিথ্যা শনাক্তের সবচেয়ে কার্যকর পথ।



