স্কিনকেয়ারের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা রকম পণ্য। ক্লিনজার, টোনার, এসেন্স, সিরাম, ময়েশ্চারাইজার, শিট মাস্ক - একেকটি ধাপের জন্য একেকটি পণ্য। দক্ষিণ কোরিয়ার কে-বিউটি এই বহু ধাপের রুটিনকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। জাপানের জে-বিউটিও এনেছিল তার নিজস্ব নিয়মকানুন।
তবে বিউটি দুনিয়ায় এখন একটু ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। এতো কিছু নয়, বরং কমেই ভালো - এই ভাবনাকে সামনে রেখে আলোচনায় আসছে অস্ট্রেলিয়ার ‘এ-বিউটি’।
‘এ-বিউটির’ দর্শন বেশ সহজ - ত্বকের যত্ন নিতে অনেকগুলো পণ্যের প্রয়োজন নেই। বরং এমন কয়েকটি পণ্য বেছে নিতে হবে, যেগুলো সত্যিই প্রয়োজনীয় এবং একাধিক কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কাটানোর বদলে সহজ রুটিনেই ত্বকের যত্ন নেওয়া।
‘লেস ইজ মোর’ - এটাই মূল কথা
অস্ট্রেলিয়ার জীবনযাপনের সঙ্গে এ-বিউটির এই সহজ দর্শনের একটা যোগ আছে। দেশটির আউটডোর সংস্কৃতি, রোদ, সমুদ্র আর খোলামেলা জীবনযাপন - সব মিলিয়ে সেখানে সাজগোজের ধারণাটাও অনেকটা স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর।
সেই ভাবনাই জায়গা করে নিয়েছে স্কিনকেয়ারেও। দশ ধাপের রুটিন মেনে চলার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পণ্য ব্যবহার করাই এ-বিউটির লক্ষ্য। একটি ময়েশ্চারাইজার যদি ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখার পাশাপাশি অন্য একটি ধাপের প্রয়োজন কমিয়ে দেয়, তাহলে আলাদা করে সেই পণ্য যোগ করার দরকার কী - এমনই যুক্তি এই ধারায়। এতে শুধু সময়ই বাঁচে না, একসঙ্গে অনেক ধরনের প্রসাধনী ব্যবহারের ঝামেলাও কমে
প্রকৃতির কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা
এ-বিউটির আরেকটি আকর্ষণ অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক উপাদান। কাকাদু প্লাম, টি ট্রি অয়েল, ফিঙ্গার লাইম, ইউক্যালিপটাস ও তাসমানিয়ান পেপারবেরির মতো উপাদান বিভিন্ন স্কিনকেয়ার পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ কাকাদু প্লামকে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম পরিচিত ফল হিসেবে ধরা হয়। ত্বকের যত্নে টি ট্রি অয়েলের ব্যবহারও বেশ পরিচিত। আর ফিঙ্গার লাইমে থাকা প্রাকৃতিক ফলের অ্যাসিডও স্কিনকেয়ার পণ্যে জায়গা করে নিয়েছে।
তবে এ-বিউটি শুধু প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। এসব উপাদানের সঙ্গে আধুনিক স্কিনকেয়ার উপাদানও ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে হাইড্রোক্সিপিনাকলোন রেটিনোয়েট (HPR), পেপটাইড ও একটোইন (Ectoin)।
সানস্ক্রিনে বিশেষ গুরুত্ব
অস্ট্রেলিয়ার তীব্র রোদের কারণে দেশটির মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সূর্যসুরক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। সেই প্রভাব রয়েছে এ-বিউটির ক্ষেত্রেও। তাই এই ধারায় প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কেমিক্যাল বা মিনারেল - যে ধরনের সানস্ক্রিনই ব্যবহার করা হোক, এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আবার সানস্ক্রিন ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়।
ত্বকের যত্নে আবারো ফিরছে সরলতা
রূপচর্চা মানেই দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক পণ্য ব্যবহার - এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে এ-বিউটি। ত্বকের প্রয়োজন বুঝে কমসংখ্যক কার্যকর পণ্য ব্যবহার, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা এবং স্বাভাবিক ত্বককে প্রাধান্য দেওয়াই এই ধারার মূল কথা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও কেন প্রাসঙ্গিক
বাংলাদেশে স্কিনকেয়ারের বাজারে বিদেশি ট্রেন্ডের প্রভাব নতুন নয়। কে-বিউটি ও জে-বিউটির নানা পণ্য যেমন এখানে জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি ত্বকের যত্নে সহজ রুটিনের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। ব্যস্ত জীবনযাপন, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং বাইরে চলাফেরার কারণে অনেকের কাছেই দীর্ঘ স্কিনকেয়ার রুটিন নিয়মিত মেনে চলা কঠিন।
সেদিক থেকে এ-বিউটির ‘কম পণ্য, সহজ রুটিন’ ধারণাটি বাংলাদেশের মানুষের জন্যও বেশ বাস্তবসম্মত হতে পারে। বিশেষ করে ক্লিনজার, ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিনের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ছোট রুটিন তৈরি করা যেতে পারে। তবে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ও বাংলাদেশের আবহাওয়া এক নয়। তাই অন্ধভাবে কোনো বিদেশি ট্রেন্ড অনুসরণ না করে নিজের ত্বকের ধরন, আবহাওয়া ও প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে এতোটুকু বলতে পারি, বিউটি ট্রেন্ড বদলাবে, নতুন নতুন পণ্যও আসবে। কিন্তু দিনের শেষে ত্বকের যত্নে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি দরকার, তা হলো নিজের ত্বকের প্রয়োজনটা বুঝে সঠিক কয়েকটি পণ্য বেছে নেওয়া। এ-বিউটি সেই সহজ কথাটাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।