প্রতিদিনের জীবনে খুব পরিচিত একটি প্রশ্ন - ‘আজ কী রান্না হবে?’ এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়েই কখনো কখনো দিনের বড় একটা সময় চলে যায়। দুপুরে কী হবে, রাতে কী খাওয়া হবে, বাজার থেকে কী আনতে হবে - এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয় পরিবারের সদস্যদের পছন্দ-অপছন্দ। কেউ ঝাল খান না, কেউ মাছ ছাড়া খেতে পারেন না, কারও আবার সবজি পছন্দ, আবার কেউ স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা ভেবে ভাত এড়িয়ে চলেন।
তাই খাবার তৈরি করা মানে শুধু রান্নাঘরে গিয়ে চুলা জ্বালানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ পরিকল্পনা, বাজার করা, উপকরণ গুছিয়ে রাখা, সবার পছন্দ মনে রাখা এবং পরের খাবারের কথাও আগে থেকেই ভেবে রাখা। অনেক পরিবারে এই পুরো দায়িত্বটাই শেষ পর্যন্ত একজনের কাঁধে এসে পড়ে। বেশির ভাগ সময় সেই মানুষটি একজন নারী।
প্রতিদিনের এই চাপ ও ক্লান্তি থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে ‘ফুড ডিভোর্স’ শব্দটি। নামটি শুনে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কথা মনে হলেও এর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং পরিবারের খাবার ঘিরে তৈরি হওয়া বাধ্যবাধকতা কিছুটা কমিয়ে নিজের সময়, পছন্দ ও স্বস্তির জন্য জায়গা করে নেওয়াই এর মূল ভাবনা।
ইয়াহু লাইফস্টাইলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
রান্না যখন আর আনন্দের থাকে না
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের দুই সন্তানের মা ক্যাথলিন ডোনাহোর অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি বাস্তব উদাহরণ। তার স্বামী দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করতেন, আর তিনি বাড়ি থেকে কাজ করতেন। ফলে ধীরে ধীরে পরিবারের রাতের খাবারের দায়িত্ব তার ওপরই এসে পড়ে।
শুরুতে বিষয়টি নিয়ে তার আপত্তি ছিল না। রান্না করা, বাজার করা, সপ্তাহের মেনু ঠিক করা - সবই যত্ন নিয়ে করতেন। কিন্তু সন্তানদের দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকার পরিস্থিতিতে খাবারের চাপ বাড়তে থাকে। একবেলার রান্না শেষ হতে না হতেই আরেক বেলার খাবারের প্রস্তুতি নিতে হতো।
একসময় রান্না নিয়ে আনন্দের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি অনুভব করতে শুরু করেন ক্যাথলিন। তখন তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে রান্না করার অভ্যাস বদলে ফেলেন। পরিবারের জন্য সব সময় বড় আয়োজন না করে সহজ খাবার, প্রস্তুত খাবার কিংবা পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই বানিয়ে নিতে পারেন - এমন খাবার বেছে নিতে শুরু করেন।
কোনো দিন গ্রিলড চিজ, কোনো দিন একেবারে সহজ কোনো খাবার। তার ভাবনাটা ছিল সহজ - পরিবারের সবাই যদি সাধারণ একটি খাবারেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে প্রতিদিন ‘নিখুঁত’ খাবার তৈরি করতে গিয়ে নিজের সব শক্তি খরচ করার প্রয়োজন নেই।
খাবারের চিন্তাও তৈরি করে মানসিক চাপ
রান্নার দায়িত্বকে আমরা অনেক সময় শুধু খাবার তৈরির কাজ হিসেবেই দেখি। কিন্তু বাস্তবে এর শুরু আরও আগে।
ফ্রিজে কী আছে, কোন উপকরণ শেষ হয়ে এসেছে, বাজার থেকে কী আনতে হবে, আজ কী রান্না করলে সবাই খুশি হবে, সন্তান কোন খাবার খেতে চাইবে না - এসব নিয়েও ভাবতে হয়। অর্থাৎ খাবারের দায়িত্বের একটি বড় অংশই এমন, যা চোখে দেখা যায় না।
এই অদৃশ্য দায়িত্বই তৈরি করে মানসিক চাপ। ইয়াহু ও ইউগভের মার্চ ২০২৬-এর এক জরিপে ১,৬৯৯ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১৬% জানিয়েছেন, পরিবারের রান্নার দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করা হয়েছে তা নিয়ে তারা প্রায়ই বিরক্তি অনুভব করেন। ১১% মানুষ বলেছেন, কোনো বিষয় বোঝাতে বা প্রতিবাদ জানাতে তারা কখনো রান্না করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
অর্থাৎ ক্লান্তির কারণ শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নাঘরে থাকা নয়। প্রতিদিন পরিবারের খাবারের পুরো ব্যবস্থাপনা মাথায় রাখাটাও কম চাপের নয়।
নিখুঁত খাবারের বদলে সহজ সমাধান
মিনিয়াপলিসের লেখক ও দুই সন্তানের মা এরিন হোয়াইটের গল্পটিও অনেকের পরিচিত মনে হতে পারে। একটা সময় রান্না তার খুব প্রিয় ছিল। রান্নার বই সংগ্রহ করা, নতুন রেসিপি খোঁজা কিংবা পরিবারের জন্য নতুন কোনো পদ তৈরি করা ছিল আনন্দের বিষয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আনন্দ কমতে থাকে। বিশেষ করে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সবার জন্য খাবার তৈরি করার চাপ তার কাছে একসময় বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। পরে তিনি সেই নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসেন। এখন পরিবারের সবাইকে একই সময়ে একই খাবার খেতে হবে - এমন বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ আগে খান, কেউ পরে। প্রয়োজন হলে যে যার মতো সহজ কিছু তৈরি করে নেন।
কখনো বড় হাঁড়ি ভরে স্যুপ বা স্টু রান্না হয়। কোনো দিন সালাদ, ডিম, স্যামন কিংবা অন্য কোনো সহজ খাবারই যথেষ্ট। এই পরিবর্তনে এরিনের জীবনে যে স্বস্তি এসেছে, সেটি ছোট নয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজলেও এখন তাকে সঙ্গে সঙ্গে রাতের খাবার নিয়ে ভাবতে হয় না। সেই সময়টুকু তিনি ব্যায়াম করতে পারেন, বই পড়তে পারেন, কাজ শেষ করতে পারেন কিংবা কিছুক্ষণ নিজের মতো থাকতে পারেন।
পরিবারের সবাই কি আলাদা আলাদা খাবেন?
‘ফুড ডিভোর্স’ মানে এমন নয় যে পরিবারের প্রত্যেকে নিজের খাবার নিয়ে আলাদা হয়ে যাবেন। বরং এর উদ্দেশ্য হলো খাবারের দায়িত্বকে এমনভাবে ভাগ করে নেওয়া, যাতে তা একজন মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না হয়ে দাঁড়ায়। কোনো দিন কেউ রান্না করতে চাইলে রান্না করবেন। অন্য দিন অন্য কেউ দায়িত্ব নিতে পারেন। রান্নার সময় বা ইচ্ছা না থাকলে সহজ খাবার হতে পারে। প্রয়োজন হলে বাইরে থেকেও খাবার আনা যায়। আবার বিশেষ দিনগুলোতে সবাই একসঙ্গে রান্না করতে পারেন, একসঙ্গে বসে খেতেও পারেন।
অর্থাৎ পরিবারের একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস বাদ দেওয়া নয়; বরং প্রতিদিনের খাবারকে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘করতেই হবে’ ধরনের চাপটা কমানোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
দায়িত্ব ভাগ মানে শুধু রান্নাঘরে যাওয়া নয়
সংসারের খাবারের দায়িত্ব ভাগ করার সময় প্রায়ই একটি বিষয় ভুলে যাওয়া হয়। রান্না মানে শুধু চুলার সামনে দাঁড়ানো নয়। মেনু ঠিক করা, বাজারের তালিকা করা, ঘরে কী আছে তা দেখা, প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, রান্না করা, খাবার পরিবেশন এবং খাওয়ার পর রান্নাঘর গুছিয়ে রাখা - সবই এই কাজের অংশ।
তাই স্বামী সপ্তাহে এক দিন রান্না করলেন আর স্ত্রী বাকি ছয় দিন করলেন - এটিকে সব সময় সমান দায়িত্ব ভাগ বলা যায় না। কারণ খাবার তৈরির আগে ও পরের কাজগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের একজন কোনো দিন যদি বলেন, ‘আজ রান্না করতে ইচ্ছা করছে না’, সেটিকে অলসতা হিসেবে না দেখে বিশ্রামের প্রয়োজন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
প্রতিদিনের খাবার নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়
একটি আদর্শ পরিবারের ছবিতে হয়তো দেখা যায়, সবাই একই সময়ে টেবিলে বসে সুন্দর করে রাতের খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব সংসার সব সময় এতটা গোছানো থাকে না। কেউ অফিস থেকে দেরিতে ফেরেন, কেউ আগে খেয়ে নেন, কোনো দিন সন্তান অসুস্থ থাকে, কারও কাজের চাপ বেশি থাকে। আবার এমন দিনও আসে, যখন রান্না করার মতো মানসিক শক্তিটুকুও থাকে না।
সেদিন রাতের খাবারে যদি ডিমভাজি আর রুটি থাকে, তাতেও সংসারে কোনো সমস্যা তৈরি হয় না। বরং রান্নার পেছনে সময় না দিয়ে কোনো দিন পরিবারের সঙ্গে গল্প করা, নিজের কাজ শেষ করা, ব্যায়াম করা কিংবা একটু আগে ঘুমিয়ে পড়া - এসবও জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ। কারণ একটি পরিবারের ভালো থাকা কত পদ রান্না হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না।
বাংলাদেশি পরিবারে বিষয়টি কতটা প্রাসঙ্গিক?
বাংলাদেশে খাবারের সঙ্গে সম্পর্কটা অন্যরকম। মায়ের হাতের রান্না, ছুটির দিনের দুপুর, ঈদের বিশেষ পদ কিংবা প্রিয় মানুষের হাতে তৈরি খাবার - এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি, আবেগ ও ভালোবাসা।
কিন্তু এই ভালোবাসার আড়ালেই অনেক সময় রান্নার দায়িত্বটা একজনের জন্য স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। বিশেষ করে নারীর ওপর পরিবারের সবার খাবারের দায়িত্ব চলে আসা নতুন কোনো বিষয় নয়।
একজন নারী চাকরি করেন, সংসার সামলান, সন্তান দেখাশোনা করেন, নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্যও সময় বের করার চেষ্টা করেন। এর সঙ্গে যদি প্রতিদিন পরিবারের প্রত্যেকের খাবারের পছন্দ-অপছন্দের হিসাবটাও তাকেই রাখতে হয়, তাহলে ক্লান্ত হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়।
এই জায়গা থেকেই ‘ফুড ডিভোর্স’ ধারণাটি বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জন্যও ভাবার মতো। এটি বিদেশি কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করার বিষয় নয়; বরং সংসারে খাবারের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করা যায়, সেই প্রশ্ন তোলার একটি সুযোগ।
শেষকথা
‘ফুড ডিভোর্স’ আসলে খাবার থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা বলে না। এটি বরং মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যেও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রতিদিন ‘আজ কী রান্না হবে?’ - এই প্রশ্নের উত্তর একজনকেই খুঁজে বের করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পরিবারের সদস্যদের খাবারের পছন্দ আলাদা হতে পারে, খাওয়ার সময়ও আলাদা হতে পারে। কেউ ভাত খাবেন, কেউ হালকা খাবার, কেউ নিজের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাবেন - এই পার্থক্যগুলোকে জায়গা দেওয়া যায়।
কখনো ঘরোয়া রান্না, কখনো সহজ খাবার, আবার কখনো বাইরে থেকে আনা খাবার - সবই হতে পারে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনের অংশ। সবকিছুকে নিখুঁত রাখার চেষ্টায় যদি একজন মানুষ প্রতিদিন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাই এই নিয়ম থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।
হয়তো কোনো কোনো দিন রান্না একটু সহজ হলেই ভালো। কারণ ভালোবাসা প্রকাশের জন্য প্রতিদিন কয়েক পদের আয়োজন দরকার হয় না। কখনো দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, কখনো কাউকে একটু বিশ্রাম দেওয়া, আবার কখনো নিজের জন্য কিছুটা সময় রেখে দেওয়াও ভালোবাসারই অংশ।
‘ফুড ডিভোর্স’-এর মূল কথাটা তাই খাবারকে বাদ দেওয়া নয় - খাবারের দায়িত্ব যেন সম্পর্কের ওপর বোঝা হয়ে না বসে, সেটুকু নিশ্চিত করা।



