যেসব খাবারে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে

ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনেরও ভূমিকা রয়েছে। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যান্সার হবে - এমন নয়। তামাক, অ্যালকোহল, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন কারণ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪০% নতুন ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এছাড়া গবেষণা বলছে, বিশেষ কিছু খাবার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন - কারসিনোজেন বৈশিষ্ট্য থাকা খাবারগুলো ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ হতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক কারসিনোজেন কী এবং কোন খাবারগুলোতে এ উপাদান থাকতে পারে-  

কারসিনোজেন কী 

যেসব উপাদান তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ও অণুজীব মানবদেহ বা কোষের ডিএনএর জিনগত পরিবর্তন ঘটায়, সেগুলোকেই কারসিনোজেন বলে। 

যে খাবারগুলোতে কারসিনোজেন থাকে -

প্রক্রিয়াজাত মাংস 

প্রক্রিয়াজাত মাছ-মাংসে ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম উপাদান থাকে। হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন হলো এমন সব রাসায়নিক যৌগ, যা মাছ-মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার সময় তৈরি হয়। বিশেষ করে মাংস গ্রিল করা, আগুনে ঝলসিয়ে কাবাব বানানো ও ভাজার সময় এগুলো বেশি তৈরি হয়। এই যৌগগুলো কারসিনোজেন হিসেবে বিবেচিত এবং কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

অতিরিক্ত ভাজা ও উচ্চতাপে রান্না করা খাবার

আলু ও শস্যজাতীয় কিছু খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা, বেক বা রোস্ট করার সময় অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হতে পারে। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলুর চিপস এবং কিছু শস্যজাতীয় খাবারে এটি পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) জানিয়েছে, পরীক্ষাগারে উচ্চমাত্রার অ্যাক্রিলামাইড প্রাণীর শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি করেছে। তবে খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে যে মাত্রায় অ্যাক্রিলামাইড পৌঁছায়, সেই মাত্রায় মানুষের ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটা বাড়ে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ট্রান্সফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার

ট্রান্সফ্যাট (ক্ষতিকর চর্বি) সমৃদ্ধ খাবার ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। চিপস, চানাচুর, শিঙাড়া, পেঁয়াজু, পিৎজা, বার্গার ইত্যাদি ফাস্ট ফুড ট্রান্সফ্যাট সমৃদ্ধ। ট্রান্সফ্যাট শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি করে, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ কলোরেক্টাল, ওভারিয়ান ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

তামাক ও তামাকজাত পণ্য

ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ বিভিন্ন তামাকজাত পণ্যে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক রয়েছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, তামাক শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ক্যান্সারসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অ্যালকোহল

অ্যালকোহলও ক্যান্সারের কারণ। অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে মুখগহ্বর, গলবিল, স্বরযন্ত্র, খাদ্যনালি, লিভার, কোলন-রেকটাম ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। শরীরে অ্যালকোহল ভাঙার সময় তৈরি হওয়া অ্যাসিটালডিহাইড ডিএনএ ক্ষতির মাধ্যমে ক্যান্সার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

শাকসবজিতে কীটনাশকের ব্যবহার

শাকসবজিতে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কীটনাশকে হেভি মেটাল (ভারী ধাতু) ও অর্গানোফসফেটসহ অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়। অর্গানোফসফেট কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করলে তা শাকসবজি ও ফলমূলে কিছুটা অবশিষ্ট থাকতে পারে। এই শাকসবজি নিয়মিত খেলে পাকস্থলী ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে তামাক ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল না খাওয়া বা সীমিত করা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় ফল, সবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি রাখাও উপকারী।

বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিমাণ কমানো এবং মাংস অতিরিক্ত উচ্চ তাপে দীর্ঘ সময় রান্না বা পুড়িয়ে না খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে কোনো একটি খাবার বাদ দেওয়ার চেয়ে সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।